জাদুকরের জাদুহীন দিন

অনলাইন ডেস্কঃ
২০ জুলাই, ২০২৬ ৪:৫০ পিএম
শেয়ার করুন:
জাদুকরের জাদুহীন দিন

ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তির আগমন ঘটেছে, সময়ের নিয়মে চলেও গেছেন অনেকে। কিন্তু লিওনেল মেসি যেন এক ব্যতিক্রমী চরিত্র, যিনি বারবার প্রমাণ করেছেন—বয়স কেবলই একটি সংখ্যা এবং প্রতিভার কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে না। ৩৯ বছর বয়সেও বিশ্বমঞ্চে একের পর এক রেকর্ড ভেঙে অনন্য এক কীর্তি গড়লেন এই ফুটবল জাদুকর। কিন্তু বর্ণিল এই গল্পের শেষটা হয়তো সোনালী ট্রফি দিয়ে রাঙানো সম্ভব হয়নি। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেনের নান্দনিক ফুটবলের সামনে রানার্সআপের বেদনা নিয়েই বিদায় নিতে হলো বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের। 

বিশ্বমঞ্চে মেসির অতিমানবীয় পারফরম্যান্স
বয়সের বাধা পেরিয়ে এবারের আসরেও দুর্দান্ত ছন্দে ছিলেন মেসি। ফাইনালের আগ পর্যন্ত ৩৯ বছর বয়সী এই তারকার নামের পাশে শোভা পাচ্ছিল ৮টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট। ক্যারিয়ারের শেষবেলায় এসে এমন অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা রূপকথাকেও হার মানায়। ২০১৪ এবং ২০২২ সালে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি (গোল্ডেন বল) পেয়েছিলেন তিনি। এবারও সেই লড়াইয়ে বেশ শক্ত অবস্থানে ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত শিরোপাজয়ী স্পেনের অধিনায়ক রদ্রির হাতে উঠেছে টুর্নামেন্ট সেরার মুকুট। 

সাধারণত গোল্ডেন বলের ভোট প্রক্রিয়া ফাইনাল ম্যাচ শুরুর আগেই সম্পন্ন হয়ে থাকে। ফলে এই সম্মাননা সবসময় চ্যাম্পিয়ন দলের খেলোয়াড়ের ভাগ্যেই জোটে না। অতীতেও এমন নজির দেখা গেছে; ২০০৬ সালে জিনেদিন জিদান, ২০১৮ সালে লুকা মদ্রিচ এবং ২০১৪ সালে স্বয়ং মেসি রানার্সআপ হয়েও টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার পেয়েছিলেন। এমনকি ২০০২ সালে একমাত্র গোলরক্ষক হিসেবে এই কীর্তি গড়েছিলেন জার্মানির অলিভার কান।

স্পেনের তরুণদের দাপট ও জয়যাত্রা
স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের নেপথ্যে ছিল তাদের তরুণ ও প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের অনবদ্য অবদান। ১৯ বছর বয়সী বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই নিজের জাত চিনিয়েছেন। পাশাপাশি স্প্যানিশ আক্রমণের নেপথ্য নায়ক ছিলেন মিকেল ওয়ারসাবাল। ২০২৪ সালের ইউরো ফাইনালে জয়সূচক গোল করা রিয়াল সোসিয়েদাদের এই ফরোয়ার্ড এবারের বিশ্বকাপেও দারুণ কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন। পুরো টুর্নামেন্টে ৫টি গোল করে দলকে ফাইনালে তুলতে বড় অবদান রাখেন তিনি।

জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে এক মহাকাব্যিক ক্যারিয়ার
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে মেসির খেলার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাই নিশ্চিতভাবেই এটি ছিল তার শেষ বিশ্বকাপ। তবে মেসির ক্যারিয়ার কখনোই শুধু ট্রফি বা মেডেলের সংখ্যা দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। শৈশবের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে ফুটবল বিশ্বে রাজত্ব করা, ২০১৬ সালে পেনাল্টি মিসের ক্ষত নিয়ে বিদায় নেওয়া এবং পরবর্তীতে রাজকীয় প্রত্যাবর্তনে একের পর এক শিরোপা জয়—সব মিলিয়ে তার গল্পটি এক অমর অনুপ্রেরণা। এই ঘুরে দাঁড়ানোর পথ ধরেই এসেছিল ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা ট্রফি।

মাঠের সবুজ ক্যানভাসে লিওনেল মেসি সবসময়ই ছিলেন এক অনন্য চিত্রশিল্পী, যাকে অনেকেই ফুটবলের ‘পাবলো পিকাসো’ বলে আখ্যায়িত করেন। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনাল ম্যাচটি হয়তো তার জন্য একরাশ হতাশা নিয়ে এসেছে, কিন্তু ফুটবল অনুরাগীদের হৃদয়ে এবং ইতিহাসের সোনালী পাতায় তার যে অনিন্দ্য সুন্দর সৃষ্টি, তা চিরকাল অম্লান থাকবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।