সাড়ে তিন ফুটের মানুষ, পাহাড়সম মন: মানবতার বাতিঘর ‘গরিবের ডাক্তার’ মজনু শেখ

শফিকুল ইসলাম জনি, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৫:১১ পিএম
শেয়ার করুন:
সাড়ে তিন ফুটের মানুষ, পাহাড়সম মন: মানবতার বাতিঘর ‘গরিবের ডাক্তার’ মজনু শেখ

উচ্চতা মাত্র সাড়ে তিন ফুট, কিন্তু মনের প্রসারতা যেন পাহাড়সম। শারীরিক নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতাকে জয় করে প্রতিদিন পুরোনো সাইকেল চালিয়ে তিনি ছুটে চলেন কর্মস্থলে। চেম্বারের দরজা খুলে বসেন মানুষের রোগমুক্তির প্রত্যাশায়। নামমাত্র খরচে আর অসহায়-দরিদ্র রোগীদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেন চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ। 

অদম্য এই মানুষটির নাম মজনু শেখ। ফরিদপুর সদর উপজেলার শিবরামপুর এলাকার পিঠা কুমড়া বাজারে গড়ে তুলেছেন তাঁর চিকিৎসাকেন্দ্র ‘আলী আকবর রিয়েল হোমিও চেম্বার’। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন চিকিৎসকই নন, পরম ভরসার ‘গরিবের ডাক্তার’ ও ‘গরিবের বন্ধু’।

৪৬ বছর বয়সী মজনু শেখের সংসারে রয়েছেন স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে। তাঁর মতোই খর্বাকৃতির এক ছোট ভাইও থাকেন তাঁরই আশ্রয়ে। তিন ভাই ও তিন বোনের টানাপোড়েনের পরিবারে বেড়ে ওঠা মজনুর শৈশব ও শিক্ষাজীবন কেটেছে তীব্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। 

তবে শারীরিক খর্বতাকে কখনো নিজের দুর্বলতা হতে দেননি তিনি। ভাগ্যের ওপর দায় না চাপিয়ে কিংবা সরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে বেছে নেন মানবসেবার পথ। নিজে টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ জুগিয়ে রাজবাড়ী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে ডিএইচএমএস সম্পন্ন করেন। এরপর ২০০৫ সালে আরিফ বাজারে ছোট্ট একটি চেম্বার দিয়ে শুরু হয় তাঁর চিকিৎসক জীবন। পরবর্তী সময়ে চেম্বারটি স্থানান্তর করেন বর্তমানের পিঠা কুমড়া বাজারে।

বর্তমানে তাঁর এই ছোট্ট চেম্বারটিই স্থানীয়দের আস্থার কেন্দ্রবিন্দু। মজনু শেখ জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজবাড়ী, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও রোগীরা তাঁর কাছে স্বল্প খরচে চিকিৎসা নিতে আসেন। এমনকি গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে তিনি নিজেই সাইকেল চালিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা পৌঁছে দেন।

তাঁর কাজের সবচেয়ে অনন্য ও মানবিক দিকটি দেখা যায় প্রতি সোমবার। এদিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এলাকার অসহায় ও হতদরিদ্র মানুষের জন্য চেম্বারের দ্বার উন্মুক্ত থাকে। কোনো ফি ছাড়াই রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দেন এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করেন।

মজনু শেখ বলেন, “অসহায় ও দিনমজুর মানুষের রোগযন্ত্রণা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। চিকিৎসার অভাবে মানুষ কষ্ট পাবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমার সামর্থ্য সীমিত, তবুও চেষ্টা করি সাধ্যের সবটুকু দিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে।”

তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে এই সেবামূলক কাজ চালিয়ে নিতে কিছুটা আর্থিক সংকটে পড়তে হচ্ছে তাঁকে। পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ আগের চেয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে।

এলাকাবাসীর মতে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে পাশ কাটিয়ে মজনু শেখ শুধু নিজের আত্মমর্যাদাই প্রতিষ্ঠা করেননি, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছেন। তাঁর এই নিঃস্বার্থ সেবা গ্রামীণ হতদরিদ্র মানুষের জীবনে বড় এক স্বস্তি।

মজনু শেখের বিশ্বাস—শারীরিক প্রতিবন্ধকতা মানুষের সক্ষমতার অন্তরায় হতে পারে না; প্রবল আত্মবিশ্বাস আর সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো সীমাবদ্ধতা জয় করা সম্ভব। সমাজের অন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরও হীনম্মন্যতায় না ভুগে কর্মমুখর হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ভবিষ্যতে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সেবায় একটি পূর্ণাঙ্গ দাতব্য হোমিওপ্যাথিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন মজনু শেখ। তবে সেই মানবিক স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজন সমাজের সহমর্মী মানুষের সহযোগিতা। 

সাড়ে তিন ফুট উচ্চতার এই মানুষটির হয়তো জাগতিক অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, কিন্তু মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর ইচ্ছায় কোনো খামতি নেই। একটি পুরোনো সাইকেল আর বুকভরা ভালোবাসা নিয়েই প্রতিদিন অসহায় মানুষের সেবায় নিরন্তর ছুটে চলেছেন এই মানবিক চিকিৎসক।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।