মাতৃসেবার ‘জীবন্ত দলিল’ লালমন বিবি: সাত দশকে ১০ হাজার নবজাতকের নিরাপদ জন্ম

অনলাইন ডেস্কঃ
৩১ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৪৩ এএম
শেয়ার করুন:
মাতৃসেবার ‘জীবন্ত দলিল’ লালমন বিবি: সাত দশকে ১০ হাজার নবজাতকের নিরাপদ জন্ম

যখন আধুনিক চিকিৎসাসেবা ছিল দুর্লভ আর গ্রামীণ মানুষের জন্য হাসপাতাল ছিল বহু দূরের পথ, তখন মাদারীপুরের প্রত্যন্ত জনপদে গর্ভবতী মায়েদের একমাত্র ভরসার নাম হয়ে উঠেছিলেন লালমন বিবি। বয়স এখন ৮৮ বছর পেরিয়েছে। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও এখনও কোনো প্রসূতির সংকটের খবর পেলে নদী পেরিয়ে, কাদা-মাটি মাড়িয়ে ছুটে যান তিনি। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে নিঃস্বার্থ মানবসেবার এক অনন্য ইতিহাস গড়ে তুলেছেন এই প্রবীণ ধাত্রী।

মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের হোগলপাতিয়া গ্রামের বাসিন্দা লালমন বিবির পুরো জীবনটাই যেন মাতৃসেবার এক জীবন্ত দলিল। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হয়ে উঠেছে তার জীবনের প্রধান ব্রত।

বিয়ের তিন দিনেই শুরু সেবা
মাত্র ১৫ বছর বয়সে আবদুল মালেক হাওলাদারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন লালমন বিবি। বিয়ের মাত্র তিন দিনের মাথায়, হাতের মেহেদির রঙ ফিকে হওয়ার আগেই এক প্রসূতি মায়ের সাহায্যে ছুটে যেতে হয়েছিল তাকে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার এই দীর্ঘ সেবাযাত্রা। 

পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বর মাসে মাদারীপুর টিবি ক্লিনিক থেকে চিকিৎসকদের দেওয়া মাত্র এক দিনের প্রশিক্ষণ নেন তিনি। সেই সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণকে সম্বল করেই শুরু হয় তার ধাত্রীসেবা। এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় ৭০ বছর। এই সুদীর্ঘ সময়ে তার হাত ধরে কোনো প্রকার জটিলতা ছাড়াই নিরাপদে পৃথিবীর আলো দেখেছে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার নবজাতক।

আত্মত্যাগ ও মানুষের ভরসা
লালমন বিবির সংসারে এক ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। বড় ছেলে শৈশবেই মারা যান। সীমিত আয়ের টানাটানির সংসার সামলেও তিনি কখনও মানবসেবা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেননি। এমনও হয়েছে, টানা কয়েক দিন বাড়ির বাইরে থেকে প্রসূতির সেবা দিয়েছেন। কখনও একদিনে পাঁচ থেকে ছয়টি প্রসব করাতে হয়েছে তাকে। নিজের সন্তানদের ঘরে অভুক্ত রেখেও অন্যের কোল আলো করে তবেই ফিরেছেন তিনি। 

প্রসবকালীন সেবার পাশাপাশি গ্রামে কোনো নারী মৃত্যুবরণ করলে নিঃস্বার্থভাবে তাকে শেষ গোসল করানোর দায়িত্বও পালন করেন তিনি। অনেক সময় নিজের পকেটের টাকা খরচ করে দূর-দূরান্তের গ্রামে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। 

স্থানীয় পশ্চিম মাদ্রা এলাকার বিলকিস বেগম বলেন, “আমার প্রথম সন্তান লালমন বিবির হাতেই নিরাপদে পৃথিবীতে এসেছিল। তিনি আমাদের কাছে আস্থার প্রতীক।” 

রাজারচরের সেফালী বেগম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের মতো গরিব মানুষের কাছে তিনিই ছিলেন ডাক্তার। তার সহযোগিতা না পেলে হয়তো আমি মা-ই হতে পারতাম না।”

ঝাউদি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. লোকমান বেপারী বলেন, “ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, লালমন বিবি কোনো ভেদাভেদ ছাড়া ডাক পেলেই মানুষের জীবন বাঁচাতে ছুটে যান।”

অবহেলার আক্ষেপ ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি
এত মানুষের সেবা করলেও জীবনের শেষ প্রান্তে এসে লালমন বিবির কণ্ঠে কিছুটা আক্ষেপের সুর। তিনি বলেন, “মানুষের সেবা করাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শান্তি। কখনো কারও কাছে পারিশ্রমিক চাইনি। আল্লাহর রহমতে হাজার হাজার মায়ের কোল আলো করেছি। যাদের পৃথিবীতে এনেছি, তারা আজ অনেকেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু খুব কম মানুষই এখন আমার খোঁজ নেয়। আমার একটাই চাওয়া—সরকার যেন আমাদের মতো ধাত্রীদের আজীবনের এই শ্রমের মূল্যায়ন করে।”

এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লালমন বিবির পাশে দাঁড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে এবং প্রয়োজনে তাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ পাঠানো হবে।

মাদারীপুর জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) মাহমুদা আক্তার কণা বলেন, “লালমন বিবি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত সততা ও দক্ষতার সঙ্গে ধাত্রীসেবা দিয়ে আসছেন। তার এই নিঃস্বার্থ অবদান পুরো জেলার জন্য গর্বের।”

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।