নেপালের ভয়াবহ বন্যার পানি কি বাংলাদেশে আসবে? বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

অনলাইন ডেস্কঃ
২৯ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৪২ পিএম
শেয়ার করুন:
নেপালের ভয়াবহ বন্যার পানি কি বাংলাদেশে আসবে? বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

নেপালের উত্তরাঞ্চলে হিমবাহ ও পাহাড়ি ঢল থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই বন্যার পানি নদীপথে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে পৌঁছানোর সুযোগ থাকলেও, দেশে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বড় ধরনের বন্যা বা বিপর্যয়ের আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে উজানে নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা।

দুর্যোগের কারণ ও নেপালে ক্ষয়ক্ষতি
বিজ্ঞানীদের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলায় হিমালয়ের পর্বত থেকে হিমবাহ ও পাথরের ধস নেমে লেন্দে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও পাথর বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে নিচের দিকে নেমে আসে। এতে মাত্র ৩০ মিনিটের ব্যবধানে গালছি এলাকায় নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। 

এই আকস্মিক বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত ৫৭০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং পর্যটকসহ নিখোঁজ রয়েছেন সহস্রাধিক মানুষ। পানির তোড়ে বহু সড়ক ও সেতু সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে।

বন্যার পানি যেভাবে বাংলাদেশে আসতে পারে
নেপালের পাহাড়ি ঢল যেসব নদীপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে:
1. প্রথমে পানি ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী হয়ে নারায়ণী-গণ্ডক নদী ব্যবস্থায় প্রবেশ করবে।
2. এরপর গণ্ডক নদী দিয়ে ভারতের বিহার হয়ে মূল গঙ্গা নদীতে মিশবে।
3. গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গে সেই পানি ফারাক্কা ব্যারাজ হয়ে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের পদ্মা অববাহিকায় প্রবেশ করতে পারে।

বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক প্রভাবের ঝুঁকি কম কেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের বন্যার উৎপত্তিস্থল থেকে বাংলাদেশের নদীপথের দূরত্ব প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার। এত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার সময় পানি বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে এবং পলি জমার কারণে স্রোতের তীব্রতা অনেকটাই হ্রাস পাবে।

  • বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মুশফিকুস সালেহীন জানান:
  • "নেপালের এই বন্যার কারণে বাংলাদেশে বড় ধরনের ক্ষতির তাৎক্ষণিক কোনো ঝুঁকি নেই। বিহার পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতেই বন্যার পানির তীব্রতা অনেকাংশে কমে যাবে। ফলে বাংলাদেশের নদীগুলোতে হঠাৎ অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধির আশঙ্কা কম।"

বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের গবেষক মো. আজাহার হোসেন বলেন:
"দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিতে গিয়ে পানির চাপ কমে যাবে। তবে আগামী ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে যদি ভারতের বিহার, উত্তর প্রদেশ কিংবা আসামের মতো উজানের অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত হয়, তবে সেই পানির সাথে যুক্ত হয়ে দ্বিতীয় দফায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।"

তিনি আরও পরামর্শ দেন, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ফারাক্কা ও তিস্তাসহ সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে সতর্ক নজরদারি বজায় রাখা প্রয়োজন।

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের মূল্যায়ন
বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, আগামী ১০ দিনে দেশের গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিকভাবে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

ভবিষ্যতের ঝুঁকি ও সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলে হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যা (GLOF) ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। আইসিআইএমওডি (ICIMOD) ও ইউএনডিপি (UNDP)-এর এক যৌথ গবেষণায় তিব্বত, নেপাল ও ভারতের অববাহিকায় এমন ৪৭টি ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করা হয়েছে।

ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সবসময়ই উজানের পানিবণ্টন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর নির্ভরশীল। তাই এই ঘটনাকে কেবল নেপালের দুর্যোগ হিসেবে না দেখে পুরো হিমালয়-গঙ্গা অববাহিকার জন্য আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে ভারত ও নেপালের সাথে নিয়মিত নদী-তথ্য বিনিময় ও পর্যবেক্ষণ জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।