বোয়ালমারীতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের অভিযোগ, শিক্ষকদের অসন্তোষ

এম এম জামান, বোয়ালমারী প্রতিনিধি, ফরিদপুরঃ
২৬ জুলাই, ২০২৬ ৪:৪৮ পিএম
শেয়ার করুন:
বোয়ালমারীতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের অভিযোগ, শিক্ষকদের অসন্তোষ

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা উপেক্ষা করে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের মাধ্যমে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে নিয়মিত কলেজে অনুপস্থিতি, স্বৈরাচারী আচরণ ও পদের অপব্যবহারের নানা অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। এতে কলেজের শিক্ষক মহলে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী অধ্যক্ষের পদ শূন্য হলে বা তাঁর অনুপস্থিতিতে পরিচালনা পর্ষদ (গভর্নিং বডি) উপাধ্যক্ষ অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বিষয়ের শীর্ষ ১০ জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের প্যানেল থেকে তিনজনের নাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাবে। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ওই প্যানেল থেকে একজনকে ছয় মাসের জন্য ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে অনুমোদন দেবেন। তবে কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজে এই বিধির কোনো প্রয়োগ করা হয়নি।

জানা গেছে, কলেজের প্রভাষক সৈয়দা দিল আশরাফী, সহকারী অধ্যাপক আব্দুল মান্নান ও অফিস সহকারী কামরুল ইসলাম পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিকে ভুল বুঝিয়ে জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে হোসনেয়ারা বেগমকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা, বিশিষ্ট শিল্পপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সিরাজুল ইসলামের মেয়ে এবং পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি কাজী শাহরিন ইসলাম ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর হোসনেয়ারা বেগমকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলেও নিয়ম অনুযায়ী নতুন করে অনুমোদন বা পরিবর্তনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। 

এ ঘটনায় কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নিলয় কুমার সাহা, শিরিন হোসেন ও রবীন কুমার লস্করকে ডিঙিয়ে নিয়োগ দেওয়ায় কলেজের শিক্ষকদের একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

অধ্যক্ষ পদের দায়িত্ব পালনেও মারাত্মক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী সপ্তাহে অন্তত পাঁচটি ক্লাস নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের নামে ক্লাস রুটিনে কোনো ক্লাস রাখা হয়নি। তিনি নিয়মিত কলেজে উপস্থিত হন না এবং টানা ৮ থেকে ১০ দিন অনুপস্থিত থেকে এক দিনে এসে পেছনের সব হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন বলেও সংশ্লিষ্টরা জানান।

এছাড়া গত ২ জুলাই বর্ষ সমাপনী পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক মানববন্ধনে অংশ নিতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠে। মানববন্ধনে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হোসনেয়ারা বেগম ও অফিস সহকারী কামরুল ইসলাম কলেজের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। যদিও অনুসন্ধানে জানা গেছে, মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী নবীন শিক্ষার্থীদের অনেকেই ক্ষমতাচ্যুত অধ্যক্ষকে চেনেন না। 

অন্যদিকে, অন্য শিক্ষকদের ‘ফ্যাসিস্ট’ বললেও অনুসন্ধানে দেখা যায়, অফিস সহকারী কামরুল ইসলাম সর্বশেষ বোয়ালমারী উপজেলার গুনবহা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন। এছাড়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হোসনেয়ারা বেগমের লেখা "নন্দিত প্রসূন" নামক কবিতার বইয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রশংসামূলক মোট ছয়টি কবিতা ঠাঁই পেয়েছে।

কলেজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন, “জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া আবশ্যক। সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানালেই কেবল পরবর্তী জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে বিবেচনা করা যায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নিয়ম ভেঙে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।” তারা আরও জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী কোনো বহিষ্কারাদেশ দুই মাসের বেশি কার্যকর থাকে না এবং সময় শেষে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বপদে বহাল হওয়ার কথা। কিন্তু সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ মো. ফরিদ আহমেদের ক্ষেত্রে সেই নিয়মও তোয়াক্কা করা হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হোসনেয়ারা বেগম সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা সভাপতির কাছে মৌখিকভাবে দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করায় আমাকে প্রথমে ভারপ্রাপ্ত উপাধ্যক্ষ এবং পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।”

এদিকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি কাজী শাহরিন ইসলামের মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে মব সৃষ্টির প্রেক্ষিতে কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফরিদ আহমেদকে অপসারণ করা হয়। সাময়িক বরখাস্তের পর তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদন করলে আদালত তাঁকে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষের বাসায় হামলা, ভাংচুর, পরিবারের নারী সদস্যদের মারধর ও লুটপাটের অভিযোগে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হোসনেয়ারা বেগমসহ সাতজনকে আসামি করে ২০২৬ সালের ১৬ জুন ফরিদপুর বিজ্ঞ জজ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন ফরিদ আহম্মেদ।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।