চাকুরির শেষ প্রান্তে এসে কতিপয় শিক্ষকের ষড়যন্ত্রে মানবেতর জীবনযাপন, ন্যায় বিচার চান অধ্যক্ষ ফরিদ আহমেদ

জাকির হোসেন, স্টাফ রিপোর্টারঃ
৩ জুলাই, ২০২৬ ৫:২৫ পিএম
শেয়ার করুন:
চাকুরির শেষ প্রান্তে এসে কতিপয় শিক্ষকের ষড়যন্ত্রে মানবেতর জীবনযাপন, ন্যায় বিচার চান অধ্যক্ষ ফরিদ আহমেদ

বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ, অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা, নিজের চিকিৎসা ব্যয়—সবকিছু যেন আজ তার কাছে এক অসহনীয় বোঝা। যে শিক্ষক জীবনের চার দশকের বেশি সময় ধরে হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলেছেন, চাকরি জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে আজ তিনিই অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন পার করছেন। মেডিকেলে অধ্যয়নরত মেয়ের পড়াশোনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাওয়া ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়েও দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ।

এমনই হৃদয়বিদারক বাস্তবতার কথা তুলে ধরে নিজের প্রতি অন্যায়, অবিচার ও জুলুমের প্রতিবাদ এবং স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ফরিদপুরের বোয়ালমারী পৌর সদরস্থ কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ মো. ফরিদ আহমেদ।

শুক্রবার(৩ জুলাই) সকালে বোয়ালমারী বাজারের একটি চাইনিজ রেস্তোরাঁয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, শিক্ষকদের আন্তঃকোন্দল ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তিনি এখনও কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কলেজের কয়েকজন শিক্ষক কর্মচারীর উস্কানিতে বহিরাগত কিছু শিক্ষার্থী তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পদত্যাগের দাবি জানায়। পরে ২৮ নভেম্বর ২০২৪ কলেজের কতিপয় শিক্ষক-কর্মচারী ও বহিরাগতদের চাপে পরিচালনা পর্ষদ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। তিনি অভিযোগ করেন, প্রচলিত বিধি অনুসরণ না করে বরখাস্তাদেশ দীর্ঘদিন বহাল রাখা হয়েছে এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তা কার্যকর রেখেছেন।

ফরিদ আহমেদ আরও দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্তে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি এবং বিষয়টি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কেও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। বরং তার বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ব্যাংক হিসাবও স্থগিত করা হয়। ফলে নিজের উপার্জনের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ও তিনি ব্যবহার করতে পারছেন না। এতে পরিবার নিয়ে তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন বলে দাবি করেন।

তিনি জানান, নিরুপায় হয়ে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালতের আদেশে চাকরি ও বেতন-ভাতার অধিকার ফিরে পান। কিন্তু তার দাবি, কলেজের একটি পক্ষ ও পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যের কারণে এখনও তাকে দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হচ্ছে না।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাকে অধ্যক্ষের বাসভবন ছাড়তে চাপ দেওয়া হয়। তিনি এতে রাজি না হওয়ায় তার বাসায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেন। এসব ঘটনার জন্য তিনি কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. হোসনেয়ারা বেগম, প্রভাষক সৈয়দা দিল আশরাফি, প্রভাষক জাহেদা বেগম, সহকারী অধ্যাপক মো. আজহার আলী, সহকারী অধ্যাপক আ. মান্নান, সেকশন অফিসার কামরুল ইসলাম এবং অফিস সহায়ক মো. মানিক হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, তার বিরুদ্ধে কলেজে একটি মানববন্ধন আয়োজন করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের এতে অংশ নিতে চাপ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অভিভাবক ও শিক্ষার্থী দাবি করেন, মানববন্ধনে অংশগ্রহণের জন্য কিছু শিক্ষক শিক্ষার্থীদের চাপ দিয়েছেন। 

সংবাদ সম্মেলনের শেষ মুহূর্তে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ফরিদ আহমেদ বলেন, "আমি এখন বয়োবৃদ্ধ। চাকরির বয়স আর মাত্র দুই মাস বাকি। এই সময়ের মধ্যে যদি দায়িত্বে ফিরতে না পারি, তাহলে অবসরজনিত প্রাপ্য, পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং জীবনের শেষ বয়সের নিরাপত্তা- সবকিছুই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যাবে। আমার বৃদ্ধ মা, অসুস্থ স্ত্রী এবং সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যায়বিচার ও স্বপদে পুনর্বহালের আবেদন জানাচ্ছি।"

স্থানীয় সচেতন মহল দাবি করেছেন, স্বনামধন্য কলেজটি আজ কতিপয় শিক্ষক কর্মচারীর ষড়যন্ত্রে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার পরিবেশ প্রশ্নেরমুখে। কতিপয় শিক্ষক ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারসহ ক্ষমতার চেয়ার আঁকড়ে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। অধ্যক্ষ ফরিদ আহমেদ দুর্নীতি করলে তার তদন্ত করে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসা উচিত তা না করে তাকে ঝুলিয়ে রাখার মধ্যে কিন্তু রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।