মধুমতির গ্রাসে বিলীন ৪৩০ পরিবারের ঠিকানা আলফাডাঙ্গায় ভাঙন রোধ ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন

কবির হোসেন, আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি, ফরিদপুরঃ
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:০১ এএম
শেয়ার করুন:
মধুমতির গ্রাসে বিলীন ৪৩০ পরিবারের ঠিকানা আলফাডাঙ্গায় ভাঙন রোধ ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় মধুমতি নদীর ভয়াবহ ভাঙনে টগরবন্দ ইউনিয়নের চাপুলিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প ও গুচ্ছগ্রাম প্রায় পুরোটাই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একসময় যেখানে সরকারি সহায়তায় প্রায় ৪৩০টি ভূমিহীন পরিবার মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছিল, ভাঙনের তীব্রতায় আজ সেখানে টিকে রয়েছে মাত্র ১১টি ঘর। চোখের পলকে বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়া শত শত মানুষ এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।

নদীভাঙন রোধ, নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দ্রুত পুনর্বাসনের দাবিতে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় চাপুলিয়া গুচ্ছগ্রামসংলগ্ন মধুমতির তীরে এক বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। চাপুলিয়া ও পার্শ্ববর্তী শিকিপাড়া গ্রামের তরুণদের উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে সর্বস্তরের এলাকাবাসী অংশ নেন। 

ঘণ্টাব্যাপী চলা এই মানববন্ধনে অংশ নেওয়া নারী-পুরুষেরা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে নদীভাঙন ও অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, আশ্রয়ণ প্রকল্প ও গুচ্ছগ্রামে দীর্ঘ ২৫-৩০ বছর ধরে প্রায় ৪৩০টি পরিবার স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করে আসছিল। কিন্তু অব্যাহত ভাঙনে একে একে তাদের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি গ্রাস করেছে নদী। বর্তমানে আশ্রয় প্রকল্পের একটি এবং গুচ্ছগ্রামের মাত্র ১০টি ঘর অবশিষ্ট রয়েছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বিলীন হওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আলফাডাঙ্গা শাখার সভাপতি মাওলানা শরীফুল ইসলাম, স্থানীয় বাসিন্দা আকিব আহমেদ, মাহমুদ হোসেন, নিয়ামুল মোল্যা ও তাইফুর রহমান প্রমুখ। বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, পাশের নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার একটি প্রভাবশালী বালু সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার দিয়ে মধুমতি নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তুলছে। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে তীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যার ফলে ভাঙন আরও ভয়াল রূপ নিয়েছে।

ভিটেমাটি হারানো ভুক্তভোগী লিয়াকত আলী (৭০), আরিফুল মোল্লা (৪৫), আজগার হোসেন (৪৫) ও বিলু মোল্যা (৩৮) আক্ষেপ করে বলেন, "আমাদের জীবনের সবটুকু সঞ্চয় ও শেষ সম্বল নদী কেড়ে নিয়েছে। সন্তানদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছি। জীবিত মানুষ হয়েও আজ আমাদের কবরস্থানের পাশে আশ্রয় নিয়ে রাত কাটাতে হচ্ছে।"

এ বিষয়ে টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিয়া আসাদুজ্জামান বলেন, "ভাঙনে চাপুলিয়ার মানুষ আজ সর্বস্বান্ত। আশ্রয়ণ ও গুচ্ছগ্রামের প্রায় সব ঘর নদীতে চলে গেছে। দ্রুততম সময়ে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী পদক্ষেপ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি পুনর্বাসন প্রয়োজন। পাশাপাশি অবৈধ বালু তোলার বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।"

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ফরিদপুরের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. মজিবর রহমান জানান, চাপুলিয়া এলাকার নদীভাঙনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। দ্রুতই ভাঙনকবলিত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নদীতীর রক্ষায় স্থায়ী প্রকল্পের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।