খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

অনলাইন ডেস্কঃ
১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২:০১ পিএম
শেয়ার করুন:
খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ করল দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আজ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দলটির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য একেবারেই ভিন্ন ও আবেগঘন। দলের দীর্ঘদিনের কাণ্ডারি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর এটিই বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ফলে আনুষ্ঠানিক উদযাপনের চেয়েও দিনটিতে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রক্ষা এবং তার অনুপস্থিতিতে দলের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণের বিষয়টিই নেতাকর্মীদের ভাবনায় প্রধান হয়ে উঠেছে।

ইতিহাসের বাঁকবদল ও চার দশকের পথচলা
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতন, ক্ষমতা ও দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি পেরিয়ে দলটি দেশের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। 

তবে জিয়াউর রহমানের প্রয়াণের পর দলটিকে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব দিয়ে সুসংগঠিত রূপ দেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮০-এর দশকে রাজনীতিতে এসে ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। পরবর্তী প্রায় চার দশক তিনিই ছিলেন বিএনপির সর্বোচ্চ অভিভাবক।

আপসহীন সংগ্রাম ও সরকার পরিচালনায় সাফল্য
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে অনন্য অবস্থান তৈরি করেন। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে এবং তিনি হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তাঁর হাত ধরেই দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও তিনি বিএনপিকে বিজয়ী করে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

তবে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুধু ক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিরোধী দলে থাকাকালে আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক সংকট এবং ২০১৮-পরবর্তী সময়ে সাজানো মামলায় কারাবাস ও দীর্ঘদিন বন্দিজীবন কাটাতে হয়েছে তাঁকে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে মুক্তি পেলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি। দীর্ঘ অসুস্থতা শেষে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

নতুন নেতৃত্বের কাঁধে ভবিষ্যতের দায়িত্ব
খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এবার স্বাভাবিকভাবেই নেমে এসেছে শোক ও স্মৃতির আবহ। নেতাকর্মীরা বলছেন, তিনি ছিলেন দলের ঐক্যের প্রতীক ও প্রেরণার উৎস। তাঁর অনুপস্থিতিতে এখন দলের হাল ধরেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি কীভাবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন ও উত্তরাধিকারকে পাথেয় করে ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে এগোবে, সেটিই এখন বড় আলোচনার বিষয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য শুধু স্মৃতিচারণের নয়, বরং সাংগঠনিক পুনর্গঠনেরও এক বড় উপলক্ষ। শীর্ষ নেতৃত্বের শূন্যতায় দলের ভেতর ভারসাম্য রক্ষা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির আদর্শ এগিয়ে নেওয়াই দলটির মূল চ্যালেঞ্জ।

দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের অবস্থান তুলে ধরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, *‘গণতন্ত্রের মাতা ও আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেখানো পথেই বিএনপির পথচলা। যতদিন বাংলাদেশ এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতি থাকবে, ততদিন বেগম জিয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁর আদর্শ ও নেতৃত্বই আমাদের ভবিষ্যৎ লড়াই-সংগ্রামের মূল শক্তি।’*

নতুন অধ্যায়ের দিকে বিএনপি
প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে বিএনপি যেমন রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে দেশ পরিচালনা করেছে, তেমনি রাজপথের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামেও নেতৃত্ব দিয়েছে। দীর্ঘ পথচলার সেই প্রধান অধ্যায় রচিত হয়েছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। এবার তাঁর শূন্যতা বুকে নিয়ে, তাঁরই রাজনৈতিক আদর্শকে পাথেয় করে দলটির নতুন নেতৃত্বের অধীনে বিএনপি প্রবেশ করল এক নতুন রাজনৈতিক যুগে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।