কাপ্তাইয়ে সংরক্ষিত বনে বহুতল ভবন নির্মাণে বন বিভাগের বাধা: ভিন্নখাতে প্রবাহের অপচেষ্টার অভিযোগ

রিপণ মারমা, কাপ্তাই প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটিঃ
১ আগস্ট, ২০২৬ ৫:০১ পিএম
শেয়ার করুন:
কাপ্তাইয়ে সংরক্ষিত বনে বহুতল ভবন নির্মাণে বন বিভাগের বাধা: ভিন্নখাতে প্রবাহের অপচেষ্টার অভিযোগ

রাঙামাটির কাপ্তাই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সীতা পাহাড়ে বেআইনিভাবে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে বন বিভাগ। এশীয় বন্যহাতির প্রধান এই অভয়ারণ্যে নিয়মবহির্ভূত নির্মাণকাজে বাধা দেওয়ায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল ঘোলাপানিতে মাছ শিকার ও অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ব্যক্তিগত ফায়দা লুটতে এবং নিজেদের অবৈধ কর্মকাণ্ড ধামাচাপা দিতেই মহলটি সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে বন বিভাগ জানিয়েছে।

ঘটনার পটভূমি ও হাতির আবাসস্থল
কাপ্তাই বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি রাঙামাটি দক্ষিণ বন বিভাগের অধীন কাপ্তাই বন রেঞ্জের রামপাহাড় বন বিটের সীতা পাহাড় ব্লকের সংরক্ষিত বনে একটি ৩ তলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। খবর পেয়ে কাপ্তাই বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৫-১৬ বছর আগে তৎকালীন ডিএফও অসিত রঞ্জন পালের দায়িত্ব পালনকালে ধ্যানের উদ্দেশ্যে সীতা পাহাড়ে একটি ছোট ঘর তৈরি করা হয়েছিল। স্থানটি লোকালয় থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বন্যহাতির পাল এটিকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বন বিভাগ জানায়, বন্যপ্রাণীর এমন সংবেদনশীল ও সংরক্ষিত এলাকায় নতুন করে কোনো বহুতল স্থাপনা নির্মাণ আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

আইন লঙ্ঘন ও সরকারি বরাদ্দের ওপর প্রশ্ন
কাপ্তাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. জামাল হোসেন তালুকদার বলেন, "অবৈধভাবে হাতির সংবেদনশীল আবাসস্থলে নতুন স্থাপনা নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। বন আইন অনুযায়ী আমরা নির্মাণকাজ বন্ধ করেছি। কিন্তু একটি সুবিধাভোগী চক্র বিষয়টিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।"

কাপ্তাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান জানান, মন্দিরটি জাঁকজমকপূর্ণ করতে এবং লোকসমাগম বাড়াতে সরকারি আইনের তোয়াক্কা না করে রাঙামাটি জেলা পরিষদ থেকে 'সীতা পাহাড় মন্দির প্রকল্পে' অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২২ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন।

রেঞ্জ কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলে বলেন, দায়িত্বশীল সরকারি বিভাগ ও আইন প্রণয়নকারীরা কীভাবে সংরক্ষিত বনের ভেতর এমন প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ ও উদ্বোধন করেন, যা প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের স্বার্থহানি ঘটাচ্ছে? 

তিনি উল্লেখ করেন, এই উদ্যোগ ১৯২৭ সালের বন আইনের ২৬ নম্বর ধারার ১(ক), (ঘ) ও ১ক(ঙ) অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া জাতীয় বননীতি ২০২৫-এর ১(৫) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— "বনবিরুদ্ধ বা বনবহির্ভূত কোনো কাজে প্রাকৃতিক বনভূমি ব্যবহার করা যাবে না।"

বন বিভাগের অবস্থান ও আইনি ব্যবস্থা
অভিযানে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে রেঞ্জ কর্মকর্তা জানান, চরম জনবল সংকটের কারণে অনেক সময় দুর্গম অঞ্চলের ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে নজরে আসে না। তবে তথ্য পাওয়ার সঙ্গেই বন বিভাগ কঠোর অবস্থান নিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়। এর আগে ২০২৫ সালেও কাপ্তাই রেঞ্জের শুকনোছড়ি বিটে অবৈধভাবে নির্মিত একটি মাদ্রাসা ও মসজিদ নির্মাণ কাজ বন্ধসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের অভিমত
পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় উপাসনালয় অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় অনেক সময় বেআইনি স্থাপনা উচ্ছেদে বন বিভাগকে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর প্রধান আবাসস্থল রক্ষায় রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যত্রতত্র ধর্মীয় বা যেকোনো ধরণের অননুমোদিত স্থাপনা গড়ার বিষয়ে কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।