জনপ্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে তালিকা: থানচিতে ত্রাণ বিতরণে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, বঞ্চিত প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা

অনুপম মারমা, থানচি প্রতিনিধি, বান্দরবানঃ
২৭ জুলাই, ২০২৬ ৬:১২ পিএম
শেয়ার করুন:
জনপ্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে তালিকা: থানচিতে ত্রাণ বিতরণে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ, বঞ্চিত প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা

বান্দরবানের থানচি উপজেলায় সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় বরাদ্দকৃত ত্রাণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে চাল বিতরণ করা হলেও অনেক প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার কোনো সহায়তা পায়নি। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক দলের পছন্দের ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করে এ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, ত্রাণ পাওয়ার তালিকা তৈরিতে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচিত চেয়ারম্যান, সদস্য কিংবা সংরক্ষিত নারী সদস্যদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। ইউপি প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে সরকারদলীয় নেতাকর্মী ও প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার মাধ্যমে তালিকা প্রস্তুত করার কারণেই এ স্বজনপ্রীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

**সরেজমিন ভুক্তভোগীদের আকুতি:**  
উপজেলার নতুনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা নিয়াজুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, "আমাদের গ্রাম থেকে ৬৫টি পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে ছিল। বন্যার সময় প্রশাসন শুকনো খাবার দিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি জেলা পরিষদের ত্রাণ সহায়তার চাল পেয়েছে মাত্র ১২টি পরিবার। বাকি পরিবারগুলো চেয়ে চেয়ে দেখেছে, যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক।"

একই গ্রামের মোহাম্মদ বেলাল হোসেন, প্রকাশ মল্লিক, পলাশ মল্লিক ও আল মামুন জানান, ২০২৩ সালের বন্যায় ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরা ঘরে ঘরে গিয়ে স্বচ্ছ তালিকা তৈরি করে সকলকে সহায়তা দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রশাসনের মাধ্যমে গোপনে তালিকা করায় তাদের নাম বাদ পড়েছে।  

প্রবীণ নারী রেজিয়া বেগম (৫২) বলেন, "ভোটের সময় আমরা দল দেখি না, মানুষকে দেখে ভোট দিই। এখন বৃদ্ধ বয়সে কার কাছে গিয়ে অভিযোগ করব? আল্লাহর ওপর ভরসা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।"  

একই চিত্র দেখা গেছে অন্যান্য পাড়াতেও। ছাংদাক পাড়ার বাসিন্দা সুইথুইঅং মারমা জানান, অন্যের কাছ থেকে ২ একর জমি বর্গা নিয়ে আবাদ করেছিলেন, কিন্তু বন্যায় ধানসহ সাথী ফসল ভেসে গেছে। এখন সহায়তার অভাবে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকার উপক্রম হলেও তিনি ত্রাণ পাননি। একই অভিযোগ জানান রুনাজনপাড়ার সূজন ত্রিপুরা এবং ঙাফাখুম পাড়ার বাসিন্দা উচয়ই মারমা, অংচিং মারমা ও টমাস ত্রিপুরা। বন্যায় ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর দিন কাটালেও সাহায্যের হাত বাড়ায়নি কেউ। স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইউছুপ বলেন, "জনপ্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে তালিকা প্রস্তুত করলে সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।"

**জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের ক্ষোভ:**  
সদর ইউপি চেয়ারম্যান অংপ্রু ম্রো, বলীপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান জিয়াঅং মারমা এবং তিন্দু ইউপি চেয়ারম্যান ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি কিংবা ত্রাণ বিতরণে আমাদের কোনো ভূমিকা রাখতে দেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা নিজেদের মনগড়া তালিকা তৈরি করে জমা দিয়েছেন।"

স্থানীয় সংবাদকর্মী চিংথোয়াইঅং মারমা ও উশৈনু মারমা জানান, জেলা পরিষদের এ সহায়তার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। ত্রাণ বিতরণের সময় জনপ্রতিনিধি কিংবা গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত না করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ আরও বেড়েছে।

**ত্রাণ বরাদ্দের চিত্র:**  
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় থানচি উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের জন্য পার্বত্য জেলা পরিষদ ১২.৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়। এর আগে বন্যাকালীন সময়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে উপজেলা প্রশাসনকে ১০ মেট্রিক টন চাল ও ১ লাখ টাকা এবং বন্যা-পরবর্তী সময়ে আরও ২০ মেট্রিক টন চাল ও ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এছাড়া বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও খাদ্য বিতরণ করে। বেসরকারি সংস্থার মধ্যে 'ব্র্যাক' ২০০ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। পাশাপাশি এনজিও 'বিএনকেএস' ৪০০ পরিবারের জন্য ৮ হাজার টাকা মূল্যের ১১টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্যাকেজ এবং 'কারিতাস বাংলাদেশ' ত্রাণ সহায়তার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

**দায়িত্বশীলদের বক্তব্য:**  
ত্রাণ বিতরণ শেষে পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থানজামা লুসাইয়ের প্রতিনিধি ও জেলা পরিষদ সদস্য খামলাই ম্রো বলেন, "জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ৬২৫ জন ক্ষতিগ্রস্তকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার ঘোষণা ছিল। তবে পরিস্থিতির কারণে ২০ কেজি করে চাল এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২ কেজি করে আলু দেওয়া হয়েছে।" তালিকার অসংগতির কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, "প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তালিকায় কোনো ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার বা কারবারির (পাড়া প্রধান) স্বাক্ষর ছিল না। জনপ্রতিনিধিদের স্বাক্ষর থাকলে তালিকাটি আরও গ্রহণযোগ্য হতো এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বাদ পড়ত না।"

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মসফিকুর রহমান বলেন, "আমরা ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের নির্দেশনায় কাজ করি। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মাধ্যমে আমাদের হাতে প্রায় ২০০ পরিবারের একটি তালিকা এসেছিল। তবে পাহাড়ধস ও কৃষিখাতের সার্বিক তালিকায় উপজেলায় প্রায় দুই হাজার ক্ষতিগ্রস্তের তথ্য রয়েছে।"

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. ওয়াহিদ হোসেন জানান, থানচির ৪টি ইউনিয়নে ২৩.৭৭ হেক্টর জমির ফসল পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আউশ ধান, সবজি, আদা, হলুদ ও ফলবাগানসহ মোট ১,০৬৫টি কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি পুনর্বাসন সহায়তা এলে তা কৃষকদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-ফয়সালের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

তবে ব্যতিক্ৰমী উদ্যোগের কথা জানান এনজিও সংস্থা 'বিএনকেএস'-এর উপ-পরিচালক উবানু মারমা। তিনি বলেন, "আমরা নিজস্ব কর্মীদের দিয়ে ঘরে ঘরে গিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করছি। এই তালিকায় কারবারি, ওয়ার্ড মেম্বার ও চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর নিয়ে প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে সহায়তা দেওয়া হবে।"

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, উপজেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতার কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তালিকা পুনর্বিবেচনা করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।