শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগের সংকট: দুর্গম হমক্রি পাড়ায় পিছিয়ে পড়া ম্রো জনপদ

শৈহ্লাচিং মারমা, রুমা প্রতিনিধি, বান্দরবানঃ
২৪ জুলাই, ২০২৬ ৩:৩৮ পিএম
শেয়ার করুন:
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগের সংকট: দুর্গম হমক্রি পাড়ায় পিছিয়ে পড়া ম্রো জনপদ

বান্দরবানের রুমা উপজেলার মংপ্রু পাড়া থেকে পাহাড়ি দুর্গম পথ ধরে প্রায় দুই ঘণ্টা হেঁটে পৌঁছাতে হয় ‘হমক্রি পাড়ায়’। যোগাযোগব্যবস্থার নাজুক অবস্থা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার অভাব, জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নিরাপদ খাবার পানি ও স্যানিটেশনের ঘোর সংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রয়েছে ম্রো সম্প্রদায়ের এই জনপদ। সরকারি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক খাতের সুফল থেকে এখানকার বাসিন্দারা এখনও অনেকাংশে বঞ্চিত বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সম্প্রতি সরকারি দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে দুর্গম এই পাড়াটি পরিদর্শন করেন রুমা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আল হাসির গুঞ্জন। নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে হমক্রি পাড়ার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি।

কারবারির নামে নামকরণ ও স্যানিটেশন সংকট:  
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, পাড়াটির আদি নাম ছিল ‘রিংতুই পাড়া’। ম্রো সমাজের প্রথা অনুযায়ী, পাড়ার কারবারির (প্রধান) নামানুসারে বর্তমানে এটি ‘হমক্রি পাড়া’ নামে পরিচিত। 

প্রায় ৪৫টি পরিবারের বাস এই পাড়ায়। তবে স্যানিটেশন ব্যবস্থার অবস্থা খুবই শোচনীয়। পুরো পাড়ায় সরকারি প্রকল্পের আওতায় মাত্র তিনটি টয়লেট নির্মিত হয়েছে। পার্শ্ববর্তী পাড়াগুলোতে প্রায় প্রতিটি পরিবার স্যানিটেশন সুবিধা পেলেও হমক্রি পাড়াটি দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলিত।

চিকিৎসাসেবা ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট:  
পাড়াটিতে কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক বা স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীকে কাঁধে করে কয়েক ঘণ্টা পাহাড়ি পথ হেঁটে মূল সড়কে পৌঁছাতে হয়, এরপর পাওয়া যায় হাসপাতালে নেওয়ার পরিবহন। গর্ভবতী নারীদের প্রসবকালীন জরুরি মুহূর্তে এ দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বর্ষাকালে সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি অচল হয়ে পড়লে চিকিৎসা পাওয়া একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে, পাহাড়ি ঝিরির পানিই এখানকার মানুষের একমাত্র ভরসা। অতীতে সরকারি এক প্রকল্পের আওতায় পানির ট্যাংক ও পাইপলাইন বসানো হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা এখন পুরোপুরি অচল। ফলে বাধ্য হয়ে গ্রামবাসীরা নিজেদের উদ্যোগেই পানির ব্যবস্থা করছেন।

জরাজীর্ণ ভবনে পাঠদান:  
শিক্ষা খাতের চিত্রও একই রকম। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘হমক্রি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে’ বর্তমানে ৫১ জন শিক্ষার্থী এবং ৫ জন শিক্ষক রয়েছেন। কিন্তু অবকাঠামোগত অবস্থা খুবই করুণ। বিদ্যালয়ের তিনটি শ্রেণিকক্ষের জন্য রয়েছে মাত্র দুটি টেবিল। প্রয়োজনীয় বেঞ্চ ও শিক্ষা উপকরণের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষকদের থাকার জন্যও নেই ভালো ব্যবস্থা, তৈরি করা হয়েছে জীর্ণ মাচাং ঘর। খেলাধুলার সামগ্রী ও মানসম্মত পরিবেশের অভাবে শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

কৃষিতে সম্ভাবনা সত্ত্বেও ভাষাগত বাধা ও ন্যায্যমূল্যের অভাব: 
হমক্রি পাড়ার ইতিবাচক দিক হলো এখানকার অধিকাংশ কৃষকই তরুণ। কয়েক বছর ধরে সেখানে ড্রাগন ফলের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে। কিন্তু যোগাযোগের বেহাল দশার কারণে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না তারা। কৃষকেরা জানান, পাহাড় থেকে মূল সড়ক পর্যন্ত মাত্র ১০ মণ ড্রাগন ফল বহন করতেই কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়। এরপর রয়েছে ট্রাকভাড়া ও অন্যান্য পরিবহন ব্যয়। ফলে বাজারে ভালো দাম থাকলেও কৃষকদের পকেটে লাভ জমা হয় খুব সামান্যই।

এছাড়া ভাষাগত সীমাবদ্ধতাও এক বড় সমস্যা। অধিকাংশ কৃষক ম্রো ভাষায় কথা বলেন এবং ভালোভাবে বাংলা বোঝেন না। ফলে উপজেলা কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ এবং ড্রাগন ফলের কৃত্রিম পরাগায়নের মতো আধুনিক প্রযুক্তির বিষয়গুলো তারা সঠিকভাবে আয়ত্ত করতে পারছেন না, যা তাদের উৎপাদন ব্যাহত করছে। 

অবশ্য দুর্গম এলাকা সত্ত্বেও উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে বীজ, চারা, জৈব সার ও পরামর্শ সেবা দিয়ে তরুণ কৃষকদের সহায়তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

উন্নয়নের মূলধারায় ফেরার আকুতি:
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও নিরাপদ স্যানিটেশনের মতো মৌলিক সুবিধা না থাকায় ম্রো সম্প্রদায়ের এই মানুষগুলো প্রতিনিয়ত বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি—অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন ও শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা হলে দুর্গম এই জনপদের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।