কোন কৌশলে ব্রাজিলকে আটকাবে, কঠিন ‘ছক’ জাপানের

অনলাইন ডেস্কঃ
২৭ জুন, ২০২৬ ৭:২৯ পিএম
শেয়ার করুন:
কোন কৌশলে ব্রাজিলকে আটকাবে, কঠিন ‘ছক’ জাপানের

চলতি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে সেলেসাওরা। অন্যদিকে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে পরের রাউন্ডে পা রেখেছে সূর্যোদয়ের দেশ জাপানও। এবার শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে এশিয়ার জায়ান্টদের প্রতিপক্ষ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। শক্তিশালী এই প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়ার আগে ব্রাজিলকে একপ্রকার চ্যালেঞ্জই ছুঁড়ে দিয়েছেন জাপানের প্রধান কোচ হাজিমে মোরিয়াসু। আর এই লড়াইয়ে জাপানের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ডাগআউটের একটি সাধারণ হোয়াইটবোর্ড।

মোরিয়াসুর ‘হোয়াইটবোর্ড’ ম্যাজিক
আধুনিক ফুটবলে যখন ট্যাবলেট বা ল্যাপটপের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, তখন জাপানের ডাগআউটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র একটি সাধারণ সাদা বোর্ড আর মার্কার পেন। প্রথমার্ধের খেলা শেষ হতেই জাপানি ফুটবলাররা ভিড় জমান এই বোর্ডের চারপাশে। সেখানে মোরিয়াসুর মার্কারের টানে আঁকা কয়েকটি সরল রেখা, তীরচিহ্ন আর ছোট ছোট বৃত্তেই লুকিয়ে থাকে পরবর্তী ৪৫ মিনিটের আসল রণপরিকল্পনা। দীর্ঘ তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে বোর্ডে আঁকা সহজ চিত্র খেলোয়াড়দের মাথায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে বলে বিশ্বাস করেন জাপানি কোচ। 

এবার এই কৌশলের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ম্যাথিউস কুনিয়া আর নেইমারদের নিয়ে গড়া ব্রাজিলের বিধ্বংসী আক্রমণভাগকে রুখতে এখন এই হোয়াইটবোর্ডেই নতুন ছক আঁকছেন মোরিয়াসু।

গতিময় ফুটবল ও প্রতি-আক্রমণ
জাপানের ফুটবল দর্শন অযথা বলের দখল ধরে রাখায় বিশ্বাসী নয়। তাদের মূল শক্তি হলো—প্রতিপক্ষের পা থেকে দ্রুত বল কেড়ে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পাল্টা আক্রমণ (কাউন্টার অ্যাটাক) চালানো। মাঝমাঠে দাইচি কামাদা, ওয়াতারু এন্দো কিংবা কেইতো নাকামুরারা একক নৈপুণ্যের চেয়ে ওয়ান-টাচ পাসিং এবং নিখুঁত টাইমিংয়ের ওপর ভরসা করেন। আর আক্রমণভাগে ফেনুর্ডের স্ট্রাইকার আয়াসে উয়েদার বুদ্ধিদীপ্ত ‘অফ দ্য বল’ রান প্রতিপক্ষের রক্ষণব্যূহ ভেঙে দিতে দারুণ কার্যকর।

মোরিয়াসুর কৌশলের ৩টি মূল স্তম্ভ
কোচ হাজিমে মোরিয়াসুর এই হোয়াইটবোর্ড ট্যাকটিকসের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে তিনটি স্তম্ভের ওপর:

১. **তাৎক্ষণিক সমন্বয় (Real-time Adjustment):** প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষের রক্ষণের দুর্বলতা বা ফাঁকা জায়গাগুলো চিহ্নিত করে হাফটাইমেই কৌশল বদলে ফেলা।
২. **জোনভিত্তিক নির্দেশনা:** মাঠের কোন দিক দিয়ে আক্রমণ শানাতে হবে কিংবা কখন ফুলব্যাকের পেছনে বল পাঠাতে হবে, তা সহজ রেখাচিত্রের মাধ্যমে ফুটবলারদের বুঝিয়ে দেওয়া।
৩. **মানসিক স্বচ্ছতা:** জটিল ট্যাকটিক্যাল ব্যাখ্যার পরিবর্তে সহজ ও ভিজ্যুয়াল দিকনির্দেশনা খেলোয়াড়দের বিভ্রান্তি দূর করে এবং মাঠে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।

কৌশলের নমনীয়তা ও ফর্মেশন বদল
ম্যাচের গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী দ্রুত নিজের কৌশল ও ফর্মেশন বদলে ফেলতে পারেন মোরিয়াসু। এই বিশ্বকাপে জাপান সাধারণত ৩-৪-২-১ ফর্মেশনে খেললেও বলের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার সাথে সাথেই তা দ্রুত ৩-৪-৩ রূপ নেয়। মাঠের একপাশে একাধিক খেলোয়াড় জড়ো করে প্রতিপক্ষকে ব্যস্ত রেখে আচমকা বিপরীত উইংয়ে বল পাঠিয়ে আক্রমণ গড়ার এই গতিশীল রণকৌশলই সামুরাই ব্লুদের মূল শক্তি।

কাগজে-কলমে কিংবা ঐতিহ্য ও তারকাখচিত দলে ব্রাজিল নিঃসন্দেহে অনেক এগিয়ে। তবে আধুনিক ফুটবল বারবার প্রমাণ করেছে, কেবল বড় নাম দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না; সঠিক পরিকল্পনা, নিখুঁত বাস্তবায়ন আর শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল দিয়ে যেকোনো পরাশক্তিকেই চমকে দেওয়া সম্ভব। 

এখন দেখার বিষয়, হাজিমে মোরিয়াসুর সেই সাধারণ হোয়াইটবোর্ডে আঁকা নতুন ছক বিশ্বকাপে আরেকটি রূপকথার জন্ম দেয়, নাকি ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবলের সামনে থমকে যায় সামুরাই ব্লুদের স্বপ্নযাত্রা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।