আলফাডাঙ্গায় ভুয়া দলিল বানিয়ে সরকারি জমি দখলের চেষ্টা, মূল হোতার ১০ বছর জেল

কবির হোসেন, আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি, ফরিদপুরঃ
২৪ জুলাই, ২০২৬ ৩:৫০ পিএম
শেয়ার করুন:
আলফাডাঙ্গায় ভুয়া দলিল বানিয়ে সরকারি জমি দখলের চেষ্টা, মূল হোতার ১০ বছর জেল

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় এক অসহায় সংখ্যালঘু বিধবার বৈধভাবে ইজারা নেওয়া সরকারি জমি জাল দলিল তৈরি করে দখলের চেষ্টার ঘটনায় দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে মূল হোতাসহ সাতজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্তদের অর্থদণ্ডও করা হয়েছে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় একজন আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।

ফরিদপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রায়ে মামলার প্রধান আসামি আকবর মোল্লা (৬০)কে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই মামলায় দলিলের সাক্ষী হুমায়ুন মোল্লাকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা দেওয়া হয়। এছাড়া শাহজাহান মোল্লা, আব্দুল মান্নান মোল্লা, আলী হায়দার, গোলাপ খান ও নুরুল ইসলামকে ৫ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। অপরদিকে, ইয়াকুব মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে ফরিদপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. রকিবুল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, আদালত মামলার নথি, পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে এ রায় দিয়েছেন। এই রায় সরকারি সম্পত্তি দখল ও দলিল জালিয়াতির বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

মামলার নথি ও তদন্ত সূত্রে জানা যায়, আলফাডাঙ্গা উপজেলার বানা ইউনিয়নের পণ্ডিতবানা গ্রামের মৃত গণেশ চন্দ্র বিশ্বাসের স্ত্রী লক্ষী রানী দাস দীর্ঘদিন ধরে পাঁচুড়িয়া মৌজার ১৭১ শতাংশ সরকারি অর্পিত সম্পত্তি বৈধভাবে ইজারা নিয়ে ভোগদখল করে আসছিলেন। তিনি নিয়মিত লিজের অর্থ ও সরকারি খাজনা পরিশোধ করতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর শারীরিক প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে ওই জমির ওপর নির্ভর করেই তার জীবিকা চলছিল।

অভিযোগ রয়েছে, জমিটির উচ্চমূল্যের কারণে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র পরিকল্পিতভাবে ভুয়া খাজনার দাখিলা, জাল স্বাক্ষর এবং মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর একটি ভুয়া সাব-কবলা দলিল তৈরি করে জমিটি দখলের চেষ্টা চালায়।

বিষয়টি ধরা পড়লে পাঁচুড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তৎকালীন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. জহুরুল হক বাদী হয়ে আলফাডাঙ্গা থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটির তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

তদন্তে পিবিআই দেখতে পায়, দলিলে উল্লেখিত দাতারা স্বাধীনতার পরই ভারতে চলে গিয়েছিলেন এবং তারা বাংলাদেশে এসে কখনো দলিল সম্পাদন করেননি। তাদের নামে ব্যবহৃত টিপসই, স্বাক্ষর ও খাজনার দাখিলাসহ বিভিন্ন কাগজপত্র জাল ছিল। তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ৩১ আগস্ট আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, সাক্ষ্যগ্রহণ ও প্রমাণ উপস্থাপনের পর আদালত সাতজনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। রায় ঘোষণার সময় পলাতক নুরুল ইসলাম ছাড়া অন্য দণ্ডপ্রাপ্তরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ভুক্তভোগী লক্ষী রানী দাস বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে তাকে অনেক কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে। জালিয়াতি চক্রের কারণে তিনি বছরের পর বছর হয়রানি, ভয়ভীতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। আদালতের রায়ে তিনি ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলে জানান এবং বিচার বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এই রায় ভূমি জালিয়াতি ও সরকারি সম্পত্তি দখলচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা দিয়েছে। একই সঙ্গে অসহায় ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষায় আইনের শাসনের প্রতি জনসাধারণের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।