ফরিদপুরে প্রথমবারের মতো ঐতিহ্যবাহী ‘হাঁস খেলা’: পুকুরপাড়ে মানুষের ঢল

নুরুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টারঃ
২৭ জুন, ২০২৬ ৩:৪৪ পিএম
শেয়ার করুন:
ফরিদপুরে প্রথমবারের মতো ঐতিহ্যবাহী ‘হাঁস খেলা’: পুকুরপাড়ে মানুষের ঢল

স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বন্দি বর্তমান প্রজন্মের কাছে যখন গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলাধুলা প্রায় বিলুপ্তির পথে, ঠিক তখনই ফরিদপুর সদরে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো ব্যতিক্রমী এক ‘হাঁস খেলা’। গত শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টায় ফরিদপুর পৌরসভার ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাইতুল আমান আদর্শ একাডেমী স্কুল সংলগ্ন একটি পুকুরে উৎসবমুখর পরিবেশে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

টেলিভিশন ও ইন্টারনেটে বিভিন্ন লোকজ খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে স্থানীয় বাসিন্দা শেখ আব্দুল গফুর প্রামাণিক (৫৭) এই প্রতিযোগিতার মূল উদ্যোগ নেন। পরে এলাকাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে মাঠ পর্যায়ে রূপ নেয় এই চমৎকার আয়োজন।

ব্যতিক্রমী এই প্রতিযোগিতায় এলাকার তরুণ, যুবক ও প্রবীণসহ মোট ২১ জন প্রতিযোগী অংশ নেন। সুশৃঙ্খলভাবে খেলা সম্পন্ন করতে প্রতিযোগীদের ৭ জন করে মোট ৩টি গ্রুপে ভাগ করা হয়। খেলার নিয়ম অনুযায়ী, পুকুরের পানিতে একটি হাঁস ছেড়ে দেওয়া হয়। সাঁতরে বেড়ানো সেই হাঁসটিকে ২০ মিনিটের মধ্যে যে আগে ধরতে পারবে, তাকেই বিজয়ী ঘোষণা করার নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়। খেলার মাঝে হাঁসটি নিজে থেকে পুকুর থেকে ডাঙায় উঠে এলে সেটিকে আবারও পানিতে ছেড়ে দেওয়া হতো। ২০ মিনিটের এই সময়সীমায় হাঁস ও মানুষের লুকোচুরি আর তুমুল উত্তেজনার মধ্য দিয়ে শেষ হয় মূল প্রতিযোগিতা।

প্রতিটি গ্রুপ থেকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হন তিনজন। তারা হলেন— প্রথম স্থান অধিকারী মো: ইয়াসিন (১৫), সে স্থানীয় বাইতুল আমান আদর্শ একাডেমির নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন পার্শ্ববর্তী কানাইপুর এলাকা থেকে আসা দর্জি কাজের শিক্ষানবিস সম্রাট মোল্লা (১৭)। আর তৃতীয় স্থান অর্জন করেন বাইতুল আমান এলাকার স্যানিটারি মিস্ত্রি সিদ্দিক মোল্লা (৫৩)। খেলা শেষে বিজয়ীদের হাতে আকর্ষণীয় পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

ফরিদপুর সদরে এর আগে কখনো এমন আয়োজন না হওয়ায়, এই বিলুপ্তপ্রায় খেলা দেখতে সকাল থেকেই পুকুরপাড়ে ভিড় জমান শত শত উৎসুক নারী-পুরুষ। দর্শকদের করতালি আর হর্ষধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। খেলা দেখতে আসা দর্শনার্থী ও বিজয়ীরা জানান, ইট-পাথরের ব্যস্ত জীবনে এমন নির্মল আনন্দ তারা দীর্ঘদিন উপভোগ করেননি।

আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা ও স্থানীয় বাসিন্দা শেখ রিপন (৩৬) বলেন, “পুরো এলাকার যৌথ উদ্যোগ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই আয়োজন করা হয়েছে। প্রথমবার হিসেবে আমরা যে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি, তা সত্যিই অভাবনীয়। এই গ্রামীণ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে আগামী বছর থেকে আরও বড় পরিসরে এই হাঁস খেলা আয়োজনের ইচ্ছা আছে। আগামীতে প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার হিসেবে একটি আস্ত খাসি উপহার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।”

প্রথমবারের এই আয়োজন সফল হওয়ায় দারুণ উচ্ছ্বসিত আয়োজক কমিটি। মূল উদ্যোক্তা শেখ আব্দুল গফুর প্রামাণিক বলেন, “আমি মূলত ইন্টারনেট ও টেলিভিশনে এই ধরনের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো দেখতাম এবং অনেকের মুখেও এর গল্প শুনতাম। তখন থেকেই নিজের এলাকায় এমন একটি আয়োজন করার প্রবল ইচ্ছা জাগে। সেই ইচ্ছা থেকেই আজ সবার সহযোগিতায় এই হাঁস খেলার আয়োজন করতে পারলাম। প্রথমবার পরীক্ষামূলকভাবে কিছুটা ঘরোয়া পরিসরে করলেও মানুষের যে ব্যাপক সাড়া ও ভালোবাসা পেয়েছি, তাতে আমরা মুগ্ধ। গ্রামীণ এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতি বছরই আরও বড় পরিসরে এই হাঁস খেলা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।”

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।