পশ্চিমবঙ্গের ভোটার হয়েও খুলনায় স্কুলের প্রধান শিক্ষক

অনলাইন ডেস্কঃ
২৯ জুন, ২০২৬ ১:৩০ পিএম
শেয়ার করুন:
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার হয়েও খুলনায় স্কুলের প্রধান শিক্ষক

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্ব, নিয়োগ বাণিজ্য এবং নানা আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম দীপক চন্দ্র সরকার, যিনি পাইকগাছার খড়িয়া নবারুণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা ও ভোটার হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে চাকরি জীবন পার করছেন। 

দুই দেশেই ভোটার তিনি ও তাঁর পরিবার 
অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীপক চন্দ্র সরকার একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। ভারতে তিনি পশ্চিমবঙ্গের উত্তর বর্ধমানের শক্তিগড় থানার ২ নম্বর বরশুল গ্রামের মনমোহন দে রোডের (১ নম্বর) বাসিন্দা ও ভোটার। অন্যদিকে, বাংলাদেশে তিনি পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়নের খড়িয়া ঢেমশাখালী গ্রামের ভোটার। 

শুধু দীপক সরকারই নন, তাঁর স্ত্রী অপর্ণা সরকার, মেয়ে জয়শ্রী সরকার, বড় ভাই দুলাল চন্দ্র সরকার ও তাঁর স্ত্রী সুশীলা সরকার এবং ছোট ভাই তাপস সরকার ও তাঁর স্ত্রী বর্ণালী সরকারও ভারতের স্থায়ী বাসিন্দা ও নিবন্ধিত ভোটার। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবারকে ভারতে রেখে দীপক চন্দ্র সরকার বাংলাদেশে স্কুল পরিচালনার আড়ালে অনিয়ম ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ পাচার করছেন।

নিয়োগ বাণিজ্য ও অনুদান আত্মসাতের অভিযোগ  
২০২৪ সালে স্কুলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও আয়া নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। এই অনিয়মের প্রতিবাদে স্থানীয় এলাকাবাসী বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি প্রদান করলে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। 

এছাড়া, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত ৫ লাখ টাকার সরকারি প্রণোদনা অনুদান খরচের ক্ষেত্রেও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরাদ্দ থেকে মাত্র ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা সাধারণ ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হলেও, বাকি টাকা ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। 

তদন্তে প্রমাণিত হলেও ব্যবস্থা গ্রহণে ধীরগতি 
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একাধিক সরকারি তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর উপজেলা রিসোর্স অফিসার মো. ঈমান উদ্দিন প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপর ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শাহজাহান আলীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি এবং একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা শিক্ষা অফিসার এস এম ছায়েদুর রহমান পৃথক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

সর্বশেষ, চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, ভোটার তালিকা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকার ভারতের পশ্চিমবঙ্গেরও ভোটার। সরকারি এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী, যেকোনো এমপিওভুক্ত পদে কর্মরত শিক্ষককে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। ফলে একজন বিদেশি নাগরিকের এই পদে বহাল থাকা সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত ও প্রশ্নবিদ্ধ।

এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) কানিজ ফাতেমা লিজা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালকের কাছে লিখিত সুপারিশ পাঠান। তবে চার মাস পেরিয়ে গেলেও মাউশি থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

অভিযুক্তের বক্তব্য
অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকার। তিনি বলেন, "আমি এ দেশেরই স্থায়ী নাগরিক, ভারতের ভোটার নই। স্কুলের অনুদান আত্মসাৎ কিংবা নিয়োগ বাণিজ্যের সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।"

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।