মিয়ানমারে ৫ বছরে নিহতের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে

অনলাইন ডেস্কঃ
২ জুলাই, ২০২৬ ২:৫২ পিএম
শেয়ার করুন:
মিয়ানমারে ৫ বছরে নিহতের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে

মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে শুরু হওয়া রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্বজুড়ে সহিংসতা ও সশস্ত্র সংঘাতের তথ্য সংগ্রহকারী আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা প্রজেক্ট’ (একলেড)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

সংঘাতের ভয়াবহতা ও হতাহতের পরিসংখ্যান
একলেড-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দেশটিতে সব পক্ষ মিলিয়ে এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১১৪ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে [১]। সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সান মন থান জানান, মিয়ানমারের এই সংঘাত এখন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এটি বেসামরিক নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে [১]। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্যের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও এই দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধকে বর্তমানে সমগ্র এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে মারাত্মক ও সক্রিয় সামরিক সংঘাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে [১]।

পটভূমি ও প্রতিরোধের সূচনা
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে দেশটির সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে [১]। সে সময় শহরগুলোতে গড়ে ওঠা সামরিক অভ্যুত্থান বিরোধী আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করা হলে গণতন্ত্রকামী বিক্ষোভকারীরা শহর ছেড়ে দুর্গম এলাকায় চলে যান এবং সেখানে গেরিলা গোষ্ঠী গড়ে তোলেন [১]। পরবর্তীতে তারা বছরের পর বছর ধরে কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু সশস্ত্র বাহিনীর সাথে জোট বেঁধে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন [১]।

প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ও রাজনৈতিক রূপান্তর
পাঁচ বছরের সামরিক শাসনের পর, জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং গত এপ্রিল মাসে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে নিজেকে বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন [১]। বিদ্রোহীদের তীব্র বাধার মুখে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এবং সু চির দলকে সম্পূর্ণ বাইরে রেখে আয়োজিত এক নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি এই পদ গ্রহণ করেন [১]। তবে বিশ্ব দরবারে নিজের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের এই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো। পাশাপাশি বিদ্রোহীরাও তাঁর নতুন শান্তি আলোচনার প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে [১]।

মানবিক বিপর্যয় ও তীব্র খাদ্য সংকট
জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধের কারণে মিয়ানমারের ভেতরে বর্তমানে প্রায় ৩৭ লাখেরও বেশি মানুষ সম্পূর্ণ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন [১]। একই সাথে চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশটির প্রতি পাঁচজন নাগরিকের মধ্যে একজন তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন [১]। বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুনে প্রায়ই গুপ্তহত্যার ঘটনা ঘটছে এবং অন্যান্য অঞ্চলগুলোতে জান্তা বাহিনীর রুশ ও চীনা যুদ্ধবিমান থেকে নিয়মিত বিমান হামলা চালানো হচ্ছে [১]।

খণ্ডিত সংঘাত ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
একলেড-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংঘাতকবলিত দেশের তালিকায় ফিলিস্তিনের পরেই ছিল মিয়ানমারের অবস্থান [১]। এই যুদ্ধে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০টিরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী জড়িত থাকায় একে বিশ্বের সবচেয়ে ‘খণ্ডিত সংঘাত’ বলা হচ্ছে [১]। ২০২৩ সালের শেষের দিকে বিদ্রোহীদের একটি বড় যৌথ অভিযানে সামরিক বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়লেও, অতি সম্প্রতি চীনের রাজনৈতিক সমর্থন এবং বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় দুটি শক্তিশালী জাতিগত বাহিনীর সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ফলে জান্তা সরকার আবার কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে ফিরে এসেছে [১]।

বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ ও আঞ্চলিক প্রভাব
নিজেদের জনবল বাড়াতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জান্তা সরকার জোরপূর্বক সেনা নিয়োগ আইন কার্যকর করে ৫০ হাজার নাগরিককে বাহিনীতে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যা নিয়ে দেশটির সাধারণ যুবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে [১]। এই চলমান যুদ্ধ শুধু মিয়ানমারেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর ফলে প্রতিবেশী থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশে লাখ লাখ শরণার্থীর অনুপ্রবেশ ঘটছে এবং সীমান্ত এলাকাগুলোতে মাদক ব্যবসা ও অনলাইন জালিয়াতির মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র গড়ে উঠছে [১]।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।