অক্সিজেন ছাড়াই আধা ঘণ্টা সমুদ্রে, যেভাবে বেঁচে ফিরলেন ডুবুরি

অনলাইন ডেস্কঃ
২৭ জুন, ২০২৬ ১২:৫০ পিএম
শেয়ার করুন:
অক্সিজেন ছাড়াই আধা ঘণ্টা সমুদ্রে, যেভাবে বেঁচে ফিরলেন ডুবুরি

গভীর সমুদ্রের তলদেশে কাজ করার সময় হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় প্রধান অক্সিজেনের লাইন। ঘুটঘুটে অন্ধকার আর তীব্র ঠাণ্ডার মাঝে কেটে যায় দীর্ঘ ৩০ মিনিট। আপাতদৃষ্টিতে অলৌকিক মনে হলেও, কোনো ধরনের স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি ছাড়াই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন ব্রিটিশ স্যাচুরেশন ডুবুরি ক্রিস লেমনস। তাঁর এই অবিশ্বাস্য ও রোমহর্ষক জীবনযুদ্ধের কাহিনী সম্প্রতি চলচ্চিত্রপ্রেমীদেরও নাড়া দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত
ঘটনাটি ঘটেছিল উত্তর সাগরের (North Sea) মাঝখানে, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০ মিটার গভীরে। ক্রিস লেমনস তখন সমুদ্রের তলদেশে একটি অফশোর অয়েল রিগের তেলবাহী পাইপলাইন রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। স্যাচুরেশন ডুবুরি হিসেবে অত্যন্ত তীব্র চাপের মাঝে একনাগাড়ে কয়েক দিন বা সপ্তাহ ধরে কাজ করা তাঁর জন্য একটি স্বাভাবিক বিষয় ছিল। কিন্তু সেদিন আর দশটা দিনের মতো কাটেনি।

হঠাৎ করেই ওপরের প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী ৮ হাজার টনের বিশাল জাহাজের কম্পিউটার সিস্টেমে গোলযোগ দেখা দেয়। প্রচণ্ড ঢেউ আর বাতাসের তোড়ে জাহাজটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দূরে সরে যেতে থাকে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিন সদস্যের ডুবুরি দলের সুপারভাইজার তাঁদের দ্রুত ডাইভিং বেলে (নিরাপদ চেম্বার) ফিরে আসার নির্দেশ দেন।

ছিঁড়ে গেল জীবনরক্ষাকারী লাইন
লেমনসের সহকর্মী ডেভিড ইউয়াসা কোনোমতে ফিরে যেতে পারলেও বিপদে পড়েন লেমনস। তাঁর ৪৫ মিটার দীর্ঘ 'আম্বিলিক্যাল কর্ড' বা সংযোগকারী পাইপটি (যা তাঁকে অক্সিজেন, গরম পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল) লোহার কাঠামোর সাথে আটকে যায়। ওপরে থাকা বিশাল জাহাজের টানে একপর্যায়ে বিকট শব্দে ছিঁড়ে যায় লেমনসের বেঁচে থাকার মূল লাইনটি। মুহূর্তের মধ্যে তীব্র অন্ধকার আর চরম একাকীত্বে ডুবে যান তিনি।

মৃত্যুর মুখে এক অদ্ভুত শান্তি
বিচ্ছিন্ন অবস্থায় লেমনস তাঁর পিঠে থাকা জরুরি রিজার্ভ ট্যাংকের ভালভ খুলে দেন। কিন্তু সেটি দিয়ে বড়জোর ৮ থেকে ৯ মিনিট শ্বাস নেওয়া সম্ভব ছিল। ওপরে তাকানোর বা সাহায্য পাওয়ার কোনো উপায় না দেখে একপর্যায়ে বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দেন তিনি। 

পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে লেমনস জানান, "যখন বুঝলাম নিজেকে বাঁচানোর আর কোনো পথ নেই, তখন অদ্ভুত এক শান্তি আমাকে ঘিরে ধরল। আমি খুব দ্রুতই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছিলাম যে সম্ভবত এখানেই আমার জীবনের সমাপ্তি ঘটছে।" 

নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন আর পরিবারের কথা ভাবতে ভাবতে একপর্যায়ে অক্সিজেন ফুরিয়ে আসায় জ্ঞান হারান লেমনস।

অলৌকিকতা নাকি নিখুঁত বিজ্ঞান?
অবশেষে ওপরের ক্রুরা জাহাজের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পর একটি রিমোট চালিত সাবমেরিন (ROV) এবং সহকর্মী ইউয়াসার সহায়তায় লেমনসকে উদ্ধার করে ডাইভিং বেলে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু ততক্ষণে কেটে গেছে দীর্ঘ ৩০ মিনিট। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাধারণ নিয়মে এতক্ষণ অক্সিজেন ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা অসম্ভব এবং বেঁচে থাকলেও মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হওয়া নিশ্চিত। 

তবে গবেষকদের মতে, এটি কেবলই অলৌকিক কোনো ঘটনা ছিল না, বরং এর পেছনে কাজ করেছে চমৎকার বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া:

ধীর শ্বাসপ্রশ্বাস: মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লেমনস আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাস ধীর হয়ে আসে এবং অক্সিজেন খরচ অনেক কমে যায়।
হেলিওক্স গ্যাসের প্রভাব: ডুবুরিদের শ্বাস নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত বিশেষ গ্যাস ‘হেলিওক্স’ (হেলিয়াম ও অক্সিজেনের মিশ্রণ) তাঁর শরীরকে দ্রুত ঠাণ্ডা করতে সাহায্য করেছিল।
শরীরের তাপমাত্রা হ্রাস (Hypothermia): ডাইভিং বেলে যখন তাঁকে ফিরিয়ে আনা হয়, তখন তাঁর শরীরের তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল মাত্র ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এই তীব্র শীতলতায় মানুষের শরীরের কোষগুলোর অক্সিজেনের চাহিদা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে, যা লেমনসের মস্তিষ্ক ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সচল রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।

পরবর্তী জীবন ও রুপালি পর্দা
এই অবিশ্বাস্য ঘটনার মাত্র তিন সপ্তাহ পর ক্রিস লেমনস আবার তাঁর পুরোনো পেশায় যোগ দেন এবং পরবর্তী ১০ বছর ডুবুরি হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি পানির নিচে যাওয়া ছেড়ে দিয়ে স্থলভাগে ডাইভ সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছেন। 

ক্রিস লেমনসের এই শ্বাসরুদ্ধকর জীবন জয়ের কাহিনী অবলম্বনে সম্প্রতি ‘লাস্ট ব্রেথ’ (Last Breath) নামে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য হলিউড চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এতে অভিনয় করেছেন উডি হ্যারেলসন, সিমু লিউ, ফিন কোল এবং ক্লিফ কার্টিসের মতো জনপ্রিয় তারকারা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।