ফরিদপুরে পেঁয়াজের বাম্পার ফলনেও কৃষকের মাথায় হাত, উঠছে না উৎপাদন খরচও

নুরুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টারঃ
২৬ জুন, ২০২৬ ৬:৫৭ পিএম
শেয়ার করুন:
ফরিদপুরে পেঁয়াজের বাম্পার ফলনেও কৃষকের মাথায় হাত, উঠছে না উৎপাদন খরচও

দেশের পেঁয়াজের ‘রাজধানী’ হিসেবে খ্যাত জেলা ফরিদপুর। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় জেলায় পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম কম থাকায় চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন এ অঞ্চলের চাষিরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় অর্ধেকেরও কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন হাজার হাজার কৃষক।

পেঁয়াজ উৎপাদনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা ফরিদপুর। জেলার ৯টি উপজেলাতেই কম-বেশি পেঁয়াজের আবাদ হলেও ভাঙ্গা, নগরকান্দা ও সালথা উপজেলায় চাষাবাদ সবচেয়ে বেশি হয়। 

সরেজমিনে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ পেঁয়াজ প্রকারভেদে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ কৃষকদের তথ্যমতে, প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরিসহ খরচ পড়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা। ফলে বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষিরা। 

কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, যেমন—মাছ, মাংস, ডিম ও সবজির দাম দিন দিন বাড়লেও পেঁয়াজের দাম দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী। এতে আগামী মৌসুমে অনেক চাষি পেঁয়াজ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ইউনিয়নের কৃষক তৈয়াব মুন্সি (৪৭) আক্ষেপ করে বলেন, "বীজ, সার, শ্রমিক আর সেচের খরচ হিসাব করলে লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই উঠছে না। এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এখন বাজারে এক কেজি গরুর মাংসও কেনা যায় না। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষ করেছেন, তারা এখন কিস্তির চিন্তায় ঘুমাতে পারছেন না। সরকার যদি দ্রুত কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তবে আমাদের পথে বসতে হবে।"

পেঁয়াজ যেহেতু পচনশীল ফসল, তাই স্থানীয়ভাবে এটি সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত আধুনিক ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, পেঁয়াজ চাষ অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সরকারিভাবে পর্যাপ্ত ‘এয়ার ফ্লো মেশিন’ (পেঁয়াজ সংরক্ষণের বাতাস চলাচল যন্ত্র) সরবরাহ করা হলে কৃষকেরা দীর্ঘমেয়াদে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে লাভবান হতে পারতেন।

ভাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোল্লা মো. মামুন জানান, চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উপজেলায় পেঁয়াজের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। এ বছর উপজেলায় ৪ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬০ হাজার মেট্রিক টন। বাম্পার ফলন ও বাজারে জোগান বেশি থাকার কারণেই বর্তমানে দাম কিছুটা কম। তবে কৃষকের ঘরে থাকা পেঁয়াজ ফুরিয়ে এলে আস্তে আস্তে দাম বৃদ্ধি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, "ফরিদপুরে প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয় এবং কৃষকেরা ভালো ফলন পান। তবে বাজারমূল্য নির্ধারণের বিষয়টি সরাসরি কৃষি বিভাগের এখতিয়ারে নেই। আমরা কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ফসল সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।"

তিনি আরও জানান, কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। পেঁয়াজ পচন থেকে রক্ষা করতে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ফরিদপুরের কৃষকদের মাঝে ১ হাজার ৪৩০টি এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ৭০০টি মেশিন বিতরণ করা হয়েছে এবং চলতি বছরে মোট ২ হাজার ৫০০টি এয়ার ফ্লো মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।