প্রতিদিন পানিতে ডুবে মারা যায় ৩০ শিশু

অনলাইন ডেস্কঃ
৩০ জুন, ২০২৬ ১:৪৫ পিএম
শেয়ার করুন:
প্রতিদিন পানিতে ডুবে মারা যায় ৩০ শিশু

বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারাচ্ছে। শিশুদের যথাযথ সুরক্ষা, প্রারম্ভিক বিকাশ এবং এ ধরনের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সরকার, উন্নয়ন সংস্থা ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা মনে করেন, শিশুদের নিয়ে সমাধানমুখী ও ধারাবাহিক সাংবাদিকতা কেবল জনসচেতনতাই বাড়ায় না, বরং সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সোমবার (২৯ জুন, ২০২৬) রাজধানীর কারওয়ান বাজারের একটি হোটেলে ‘পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধসহ শিশুর সার্বিক বিকাশ ও সুরক্ষা’ বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের মিডিয়া নীতিনির্ধারক ও গেটকিপারদের পরামর্শ সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে উন্নয়ন সংস্থা সিনারগোস।

**ভয়াবহ পরিসংখ্যান ও বাস্তব চিত্র**
সভায় জানানো হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সাঁতার শেখার বয়স হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ জন এবং সাঁতার শেখার বয়স পর্যন্ত সব শিশুকে বিবেচনায় নিলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এই ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সরকার কমিউনিটিভিত্তিক শিশু যত্ন কেন্দ্র ও সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ নিলেও প্রথম ধাপ শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটির ধারাবাহিকতা কিছুটা ব্যাহত হয়েছে।

**কার্যক্রমের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা**
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিনারগোসের সিনিয়র প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট রিজওয়ানুল হক খান। তিনি জানান, ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ নিশ্চিত করতে কমিউনিটিভিত্তিক শিশু যত্ন কেন্দ্রের কার্যকারিতা দেশে ও বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। প্রকল্পের প্রথম ধাপে ২ লাখের বেশি শিশু এই সেবা পেয়েছে এবং প্রায় ৫০০ শিশু সফলভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকদের মতে, এই শিশুরা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও সৃজনশীল।

তিনি আরও জানান, প্রথম ধাপ শেষ হওয়ার পরও ৮ হাজার কেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ২ হাজার কেন্দ্র স্থানীয় জনগণের নিজস্ব উদ্যোগে কোনো আর্থিক সহায়তা ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে, যা এই প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা ও স্থায়িত্বের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। বর্তমানে প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে দেশের ৩০টি জেলার ৭৯টি উপজেলায় কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এর আওতায় প্রায় ৭ লাখ শিশুকে সাঁতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং প্রায় ৩ লাখ শিশুকে কমিউনিটি চাইল্ড কেয়ার সেন্টারের আওতায় আনা হবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ১৩ হাজার চাইল্ড কেয়ার সেন্টার এবং ২৬ হাজার কেয়ারগিভার মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন।

**বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের অভিমত**
সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুরুজ্জামান বলেন, "একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শিশুদের হাত ধরে। তাই শিশুদের সুরক্ষা ও বিকাশ নিশ্চিত করা কেবল সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং একটি টেকসই রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত।" তবে জাতীয় বাজেটে শিশুদের জন্য বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় এখনো অত্যন্ত সীমিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে মাসরুর রনি বলেন, কয়েক বছর আগেও পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর খবর মূলত সাধারণ ঘটনাভিত্তিক প্রতিবেদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ধারাবাহিক অ্যাডভোকেসির ফলে এখন গণমাধ্যমে সমাধানমুখী, অনুসন্ধানী ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন গুরুত্ব পাচ্ছে। তিনি শিশুবান্ধব সাংবাদিকতাকে জাতি গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে অভিহিত করেন। 

অনুষ্ঠানে সিনারগোস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এশা হুসাইন, আইসিবিসি প্রকল্পের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম চৌধুরী এবং চর্চা ডটকমের সম্পাদক সোহরাব হোসেন বক্তব্য দেন। এছাড়া দীপ্ত টেলিভিশনের হেড অব নিউজ এস এম আকাশ, এটিএন নিউজের শহিদুল আজম, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের লিটন হায়দার এবং টাইমস অব বাংলাদেশের সম্পাদক আবুল কালাম আজাদসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সম্পাদকরা উপস্থিত থেকে শিশু সুরক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে নিজ নিজ মতামত ও সুপারিশ তুলে ধরেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।