ঈদগাহের জমি ঘিরে দ্বন্দ্বের নতুন মোড়: আলফাডাঙ্গায় চাঁদাবাজি মামলা নিয়ে তুমুল বিতর্ক

কবির হোসেন, আলফাডাঙ্গা প্রতিনিধি, ফরিদপুরঃ
২০ জুন, ২০২৬ ৭:৩২ পিএম
শেয়ার করুন:
ঈদগাহের জমি ঘিরে দ্বন্দ্বের নতুন মোড়: আলফাডাঙ্গায় চাঁদাবাজি মামলা নিয়ে তুমুল বিতর্ক

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার বুড়াইচ ইউনিয়নের টিকরপাড়া গ্রামে ঈদগাহ-সংলগ্ন জমিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সম্প্রতি চাঁদাবাজি, মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলাকে ঘিরে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও বিতর্ক।

স্থানীয়দের মতে, এটি কেবল একটি মামলার বিষয় নয়,বরং বহুদিনের জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, সামাজিক প্রভাব বিস্তার এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে সৃষ্ট দ্বন্দ্বেরই নতুন পরিণতি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টিকরপাড়া গ্রামের ফয়জাল মোল্যা গং ও ইসমাইল হোসেন গংয়ের মধ্যে ঈদগাহ-সংলগ্ন জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ বিরোধ জমির সীমানা ছাড়িয়ে সামাজিক, ধর্মীয় ও নেতৃত্বের প্রশ্নেও বিস্তৃত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ ও সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি।

সম্প্রতি মাছ চাষি মো. ইসমাইল হোসেন তার প্রতিবেশী ফয়সাল মোল্যাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মারধর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে ফরিদপুরের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৯ নম্বর আমলি আদালতে একটি নালিশি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর থেকেই এলাকায় শুরু হয়েছে নানা আলোচনা, গুঞ্জন ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য।

মামলার বাদী মো. ইসমাইল হোসেনের কাছে মামলার সাক্ষীদের বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যারা আজ আমার বিরুদ্ধে কথা বলছেন, তারা একসময় আমার পক্ষেই ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তারা প্রতিপক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় এখন আমার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এছাড়া প্রতিপক্ষ আমার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছে। সেই প্রেক্ষাপটেই আমি আইনগত প্রতিকার চেয়ে তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেছি। 

অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষ অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে।

মামলার অভিযুক্ত জসিম মোল্যা বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্রমূলক। আমরা কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বা হুমকির সঙ্গে জড়িত নই। বরং আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। আদালতের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

টিকরপাড়া গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য পলাশ মাহমুদ বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। বাস্তবে কোনো চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেনি বলে আমার জানা নেই। এটি মূলত জমি ও সামাজিক আধিপত্যকে কেন্দ্র করে চলমান বিরোধের বহিঃপ্রকাশ। 

পাশাপাশি ইসমাইল হোসেনের ভাইকে ইমাম নিয়োগ এবং ইমামতিকে কেন্দ্র করেও কিছু মতবিরোধ রয়েছে।

একই গ্রামের বাসিন্দা হাসান মোল্যা, কুটি মিয়া ও বাচ্চু মোল্যাসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, জমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। তবে চাঁদাবাজির মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। এ অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। জমিজমা-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে একাধিকবার সামাজিকভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।

মামলার সাক্ষী পান্নু বিশ্বাস বলেন, চাঁদাবাজির বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। ঘটনাটি যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সে ধরনের কোনো ঘটনার প্রমাণ আমার চোখে পড়েনি। এমনকি আমাকে এই মামলার সাক্ষী করা হয়েছে, সেটিও আমি আগে জানতাম না।

বুড়াইচ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব পান্নু বলেন, এটি দীর্ঘদিনের জমি-সংক্রান্ত বিরোধ। চাঁদাবাজির মতো কোনো ঘটনার সত্যতা আমাদের জানা নেই। আমরা একাধিকবার উভয় পক্ষকে নিয়ে সমঝোতার চেষ্টা করেছি, কিন্তু এখনো স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

আলফাডাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফকির তাইজুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের আশা, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আদালতের রায়ের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে এবং দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিরোধের একটি গ্রহণযোগ্য ও স্থায়ী সমাধান বেরিয়ে আসবে। এতে করে এলাকার সামাজিক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকবে।   

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।