প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে যেসব বিষয়ে আলোচনা হবে

অনলাইন ডেস্কঃ
২০ জুন, ২০২৬ ১২:৪৬ পিএম
শেয়ার করুন:
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে যেসব বিষয়ে আলোচনা হবে

দিল্লি নাকি বেইজিং—কোথায় আগে যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর থেকেই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে এ নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছিল[1]। অবশেষে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে আগামীকাল রোববার (২১ জুন) মালয়েশিয়া যাচ্ছেন[1]। সেখান থেকে সরাসরি তিনি বহুল আলোচিত ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চীন সফরে যাবেন[1]। আগামী ২২ থেকে ২৬ জুন সস্ত্রীক বেইজিং সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী[1]।

ভূরাজনীতি, জাতীয় স্বার্থ এবং দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা[1]।


১. সফরের বিস্তারিত সূচি ও সফরসঙ্গী

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় দ্বিপক্ষীয় সফর শেষে ২২ জুন বিকেলে কুয়ালালামপুর থেকে চীনের দালিয়ানের উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী[1]।

  • ২৩ জুন: দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী[1]।

  • ২৪ জুন: বিকেলে বুলেট ট্রেনে চড়ে বেইজিং পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা[1]।

  • ২৫ ও ২৬ জুন: বেইজিংয়ে ব্যস্ত সময় কাটাবেন তিনি। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিকবিষয়ক প্রধানের সঙ্গে তাঁর পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে[1]। এছাড়া তিনি একটি বিনিয়োগ ফোরামের বৈঠকেও অংশ নেবেন[1]।

সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন: প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবায়দা রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং পররাষ্ট্র সচিবসহ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা[1]।


২. চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (MoU)

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে এই সফরে ৩টি চুক্তি ও ১০টিরও বেশি সমঝোতা স্মারক সই হতে যাচ্ছে[1]। সহযোগিতার প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন[1]

  • কৃষি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ[1]

  • কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও যোগাযোগ[1]

  • গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সহযোগিতা[1]

এছাড়াও, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে[1]।


৩. রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিকদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে ঢাকা-বেইজিং রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের একটি নতুন ভিত্তি তৈরি হতে যাচ্ছে[1]。

  • যৌথ ইশতেহার: দীর্ঘ দুই দশক পর এই শীর্ষ বৈঠক শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে ‘যৌথ ইশতেহার’ ঘোষণা করা হবে[1]। এর আগে ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বেইজিং সফরের সময় যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছিল[1]।

  • আন্তর্জাতিক ফোরামে সমর্থন: সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘ওয়ান চায়না’ নীতি এবং তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের অবস্থানের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হবে[1]। পাশাপাশি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (GDI)-এ বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার ঘোষণা আসতে পারে[1]। অন্যদিকে আরসিইপি (RCEP), ব্রিকস (BRICS) ও সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনে (SCO) যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বেইজিংয়ের সমর্থন চাইবে ঢাকা[1]।


৪. তিস্তা প্রকল্প ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা

সফরে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও টেকসই নদী প্রকল্প[1]। আশা করা হচ্ছে, তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে, যদিও অর্থায়নের বিষয়টি চূড়ান্ত হতে আরও কিছু কারিগরি ও আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে[1]।

এছাড়া রেল যোগাযোগ, গ্রিন এনার্জি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিসহ প্রায় ১২-১৩টি খাতে চীন থেকে প্রকল্প ও অর্থনৈতিক সহায়তা চাওয়া হবে[1]।


৫. বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

  • অধ্যাপক এম শহীদুজ্জামান (আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক): তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত বিচক্ষণ বলে উল্লেখ করেছেন[1]। ভারতের সাথে সম্পর্কের বিদ্যমান টানাপোড়েনের মাঝে এই চীন সফর বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত জোরালো কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে কাজ করবে[1]। তিনি চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর জোর দেন[1]।

  • এম হুমায়ূন কবির (সাবেক রাষ্ট্রদূত): তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বড় ধরণের অর্থনৈতিক ও ক্যাশ সাপোর্ট প্রয়োজন, যা বেইজিংয়ের পক্ষেই দেওয়া সম্ভব[1]। তাই এই সফরের অর্থনৈতিক দিকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ[1]। একই সাথে তিনি উল্লেখ করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে যদি বেইজিংয়ের কোনো কৌতূহল থাকে, তবে সেটিরও যৌক্তিক ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রস্তুত রাখা দরকার[1]।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।