পাহাড় ধস প্রতিরোধে থানচির সীমান্ত সড়কে জুম চাষ ও গাছ কাটায় নিষেধাজ্ঞা

অনুপম মারমা, থানচি প্রতিনিধি, বান্দরবানঃ
৮ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৪৫ এএম
শেয়ার করুন:
পাহাড় ধস প্রতিরোধে থানচির সীমান্ত সড়কে জুম চাষ ও গাছ কাটায় নিষেধাজ্ঞা

বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও পাহাড় ধসে সীমান্ত সড়কের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়া রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বান্দরবানের থানচি উপজেলা প্রশাসন। থানচি-লিটক্রে (লিকড়ি) সীমান্ত সড়ক সংলগ্ন উভয় পাশের ঢালে জুম চাষের উদ্দেশ্যে গাছ কাটা, আগুন দেওয়া এবং পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে—এমন সব কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।

গত ৬ আগস্ট সন্ধ্যায় থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল-ফয়সাল স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। গণবিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট জানানো হয়, সড়কের উভয় পাশের ঢালে গাছ কাটা, আগুন দেওয়া, মাটির উপরিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা ভূমিধসের ঝুঁকি সৃষ্টি করে—এমন কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। কেউ নির্দেশ অমান্য করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি হলেই পাহাড়ি ঢালের মাটি আলগা হয়ে সড়কের ওপর ধসে পড়ে। এর ফলে থানচি-আলীকদম-লিকড়ি সীমান্ত সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি কয়েক দিন পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি জরুরি সেবাগ্রহীতারা চরম দুর্ভোগে পড়েন। ব্যাহত হয় খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধ পরিবহন। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের প্রাকৃতিক বৃক্ষ ও ঘাসের শিকড় মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখে। কিন্তু জুম চাষের প্রস্তুতির সময় নির্বিচারে গাছপালা কেটে আগুনে পুড়িয়ে ফেলায় মাটির প্রাকৃতিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যায়। ফলে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই সহজেই পাহাড় ধসে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে।

এ বিষয়ে থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল-ফয়সাল বলেন, "সীমান্ত সড়কটি কেবল একটি যোগাযোগ পথ নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। পাহাড়ে জুম প্রস্তুত করতে গিয়ে গাছ পুড়িয়ে ফেললে বা মাটি ক্ষয় করলে ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই জনস্বার্থে ও সুরক্ষার কথা চিন্তা করে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।" তিনি আরও জানান, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সড়ক নিরাপদ রাখতে কারবারি, হেডম্যান, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে সম্মিলিতভাবে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করা হবে।

নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিকে সময়ের উপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় নেতৃত্ব। থানচি সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অংপ্রু ম্রো বলেন, "পাহাড় রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। জুম চাষ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবিকা হলেও সড়কের একেবারে গা ঘেঁষে ঢালের গাছ কেটে ও আগুন দিয়ে জমি প্রস্তুত করা পুরো এলাকার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।"

পর্দ্দা মৌজার হেডম্যান হাবরু ম্রো জানান, প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিকল্প উপায়ে জুম চাষের প্রবণতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত নজরদারি ও আইনি কঠোরতা বজায় রাখার প্রতিও জোর দেন তিনি।

বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য খামলাই ম্রো বলেন, "পাহাড় শুধু কোনো ভূখণ্ড নয়; এটি আমাদের বন, জীববৈচিত্র্য ও পানির মূল উৎস। সীমান্ত সড়কের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার স্বার্থে পাহাড়ের ঢাল রক্ষা করা আবশ্যক। প্রশাসনের জারি করা নির্দেশনার সুষ্ঠু বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণ, জুমচাষি ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগই পারে ভবিষ্যতে ভয়াবহ ভূমিধস থেকে থানচি-বান্দরবান, থানচি-আলীকদম ও থানচি-লিটক্রে সীমান্ত সড়ক নিরাপদ রাখতে।"

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।