হজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম-দুর্নীতি, কোরবানির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

অনলাইন ডেস্কঃ
২০ জুন, ২০২৬ ১২:৫২ পিএম
শেয়ার করুন:
হজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম-দুর্নীতি, কোরবানির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

জীবনের সব জমানো সঞ্চয় দিয়ে পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে বেসরকারি হজ এজেন্সিগুলোর চরম অব্যবস্থাপনা ও প্রতারণার শিকার হয়েছেন অনেক বাংলাদেশি হাজি। কোরবানি করার জন্য এজেন্সির হাতে টাকা তুলে দিলেও বাস্তবে কোরবানি না করে সেই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে একাধিক এজেন্সির বিরুদ্ধে। দেশে ফিরে অনেক হাজি এ বিষয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।

নুসূক অ্যাপে মিলছে না কোরবানির তথ্য
সৌদি সরকারের নিয়ম অনুযায়ী চলতি বছর থেকে ‘নুসূক’ (Nusuk) অ্যাপের মাধ্যমে হজের কোরবানি দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। কোরবানি সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা এই অ্যাপের মাধ্যমে যাচাই করার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও এজেন্সিগুলোকে নুসূক অ্যাপে হাজিদের কোরবানির তথ্য যুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে অনেক এজেন্সি এই নির্দেশ অমান্য করায় হাজিরা তাঁদের কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার কোনো ডিজিটাল প্রমাণ বা তথ্য পাচ্ছেন না। ফলে হাজিদের মনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।

তামাত্তু হজকে 'ইফরাদ' দেখিয়ে প্রতারণা
হজের প্রধান তিনটি প্রকারের মধ্যে ‘তামাত্তু’ ও ‘কিরান’ হজে কোরবানি দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও ‘ইফরাদ’ হজে কোরবানির বাধ্যবাধকতা নেই। বাংলাদেশের অধিকাংশ হাজিই তামাত্তু হজ পালন করেন। অভিযোগ উঠেছে, হাজিদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অনেক এজেন্সি তাঁদের তামাত্তু হজের কথা বলে ‘ইফরাদ’ ক্যাটাগরিতে নিবন্ধন করিয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এক চিকিৎসক জানান, তাঁর কাফেলার সবাই তামাত্তু হজ করলেও এজেন্সি শতাধিক ব্যক্তিকে ইফরাদ হাজি হিসেবে দেখিয়েছে। একইভাবে, ‘আল মূলতাজিম হজ কাফেলা ট্রাভেলস’ নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়া ৮০ জন হজযাত্রীকে ‘দূয়ুফুর রহমান ট্রাভেলস’ নামের লিড এজেন্সির মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, দূয়ুফুর রহমান ট্রাভেলস চলতি বছর প্রায় ২,২০০ জন হাজি পাঠালেও কোরবানি দিয়েছে মাত্র ১,৩৫০ জনের। বাকি ৮৫০ জনকে কোরবানি ছাড়াই ‘ইফরাদ’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নানান অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়
হাজিদের অভিযোগ, মূল হজ প্যাকেজের বাইরে কোরবানির জন্য অতিরিক্ত টাকা নেওয়া ছাড়াও সৌদি আরব যাওয়ার আগেই ‘ভুলের দম’ (হজের ভুলত্রুটি সংশোধনের কোরবানি) বাবদ অগ্রিম টাকা নেওয়া হয়েছে। ঢাকার বনশ্রীর এক ভুক্তভোগী জানান, সরকারি নিয়মে সাড়ে ৬ লাখ টাকার প্যাকেজের ভেতর কোরবানি অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা থাকলেও এজেন্সি কোরবানি ছাড়াই তাঁর কাছ থেকে ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়েছে। এরপর পরিবারের চার সদস্যের প্রত্যেকের কাছ থেকে অতিরিক্ত কোরবানির টাকা নেওয়া হলেও কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি এজেন্সি।

অভিযোগ প্রত্যাহারে টাকার প্রলোভন ও চাপ
হাজিরা দেশে ফিরে অভিযোগ করার পর অভিযুক্ত এজেন্সিগুলো তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অতিরিক্ত নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে এজেন্সিগুলো শর্ত দিচ্ছে যেন হজ অফিসে দায়ের করা অভিযোগ তুলে নিয়ে সমঝোতা পত্রে সই করা হয়।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ‘আল মূলতাজিম’-এর স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমদ জানান, তাঁরা কোনো অর্থ আত্মসাৎ করেননি এবং ৮০ জনের মধ্যে ৭৫ জনের কোরবানির টাকা মূল লিড এজেন্সিকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। দেশ থেকে অগ্রিম ‘দম’-এর টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, সৌদি আরবে মুদ্রা বহনের জটিলতার কারণেই এমনটি করা হয়েছিল। অন্যদিকে, ‘দূয়ুফুর রহমান ট্রাভেলস’-এর কর্ণধার আব্দুর রহমান দাবি করেন, তাঁর কাছে সব প্রমাণ রয়েছে এবং আইটি কর্মীর সংকটের কারণে নুসূক অ্যাপে তথ্য আপডেট করা সম্ভব হয়নি।

মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সাড়ে ৭৮ হাজার হজযাত্রীর মধ্যে প্রায় ৭৪ হাজারই গেছেন বেসরকারি এজেন্সির অধীনে। তবে মোট কতজন কোরবানির টাকা দিয়েছেন এবং সবার কোরবানি সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হজ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আয়াতুল ইসলাম জানিয়েছেন, বাংলাদেশি হাজিদের বড় অংশই তামাত্তু হজ করেন। কোনো এজেন্সি সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করলে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, তাৎক্ষণিকভাবে সব এজেন্সির অনিয়ম ধরার কার্যকর প্রযুক্তিগত উপায় সরকারের হাতে না থাকলেও হাজিদের সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।