এক কলেজে তিন অধ্যক্ষ, তিন সভাপতি!

অনলাইন ডেস্কঃ
১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:১৮ এএম
শেয়ার করুন:
এক কলেজে তিন অধ্যক্ষ, তিন সভাপতি!

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার দুর্গাহাটা ডিগ্রি কলেজে অধ্যক্ষ ও গভর্নিং বডির সভাপতি পদ নিয়ে নজিরবিহীন জটিলতা তৈরি হয়েছে। এক প্রতিষ্ঠানেই তিন ব্যক্তি নিজেদের ‘ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ’ এবং আরও তিন ব্যক্তি ‘সভাপতি’ দাবি করায় কলেজটিতে চরম প্রশাসনিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এর ওপর বিতর্কিত একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশকে কেন্দ্র করে বিরোধ এখন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। পাল্টাপাল্টি রিট ও আইনি লড়াইয়ের কারণে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক পড়াশোনার পরিবেশ ও শিক্ষার মান নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ঘিরে নতুন বিতর্ক  
সম্প্রতি স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকায় কলেজটির বিভিন্ন পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তবে কার অনুমোদনে এবং কোন কমিটির সিদ্ধান্তে এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দাবি, বৈধ কমিটি না থাকা সত্ত্বেও পেছনের দরজা দিয়ে অসাধু উদ্দেশ্যে এই নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। 

অধ্যক্ষের চেয়ার নিয়ে বিভ্রান্তি  
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ আমলে দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোজাফফর হোসেন পদত্যাগ করেন। এরপর ময়নুল আহসান দায়িত্ব নিলেও কমিটি নিয়ে বিরোধের জেরে তিনি গত প্রায় ছয় মাস ধরে কলেজে যাচ্ছেন না। তাঁর অনুপস্থিতিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও শিক্ষকদের একাংশের সুপারিশে জিয়াউল ইসলাম জুয়েলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে ময়নুল আহসান নিজেকে এখনো বৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দাবি করছেন। নিয়মিত অধ্যক্ষ উপস্থিত না থাকায় কলেজের দাপ্তরিক নথিপত্র, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অনলাইন ব্যবস্থাপনার পাসওয়ার্ড কার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—তা নিয়ে চরম বিভ্রান্তি চলছে।

সভাপতির পদে ত্রিমুখী টানাটানি  
শুধু অধ্যক্ষই নন, গভর্নিং বডির সভাপতির পদ নিয়েও চলছে ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব। বিগত কমিটির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন লিটনকে অপসারণের পর প্রথমে আকিল আহম্মেদ মমিন সভাপতি হন। পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সুপারিশে (ডিও লেটার) রবিউল আলম অশ্রুর নাম সামনে আসে। একই সঙ্গে শাহজালাল মানিক নামে আরেক ব্যক্তিও সংসদ সদস্যের সুপারিশ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠির কথা উল্লেখ করে নিজেকে সভাপতি দাবি করছেন। 

আইনি লড়াই ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য  
সভাপতি পদ দাবিদার আকিল আহম্মেদ মমিন বলেন, “আওয়ামী লীগ আমলে গঠিত কমিটির বিরুদ্ধে আমরা হাইকোর্টে রিট করে রায় পেয়েছিলাম। বর্তমানে কলেজটিতে তিনটি পক্ষ বৈধতা দাবি করছে। শাহজালাল মানিকের নেতৃত্বাধীন কমিটির নিয়োগ কার্যক্রমের ওপর উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও বেআইনিভাবে পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। আমরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন ও আইনি পদক্ষেপ নেব।”

এদিকে অপর দাবিদার শাহজালাল মানিকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য না করে সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং পরে কথা বলবেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

উদ্বেগে শিক্ষক, অভিভাবক ও জমিদাতারা  
কলেজের জমিদাতা মো. আশরাফ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বারবার কমিটি পরিবর্তন ও পদ নিয়ে বিরোধের কারণে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম নষ্ট হচ্ছে। শিক্ষকরা পাঠদানে মনোযোগ দিতে পারছেন না। আমরা চাই দ্রুত বিরোধ মিটিয়ে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক।”  
কলেজের শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন জানান, এই প্রতিষ্ঠানে মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়াশোনা করে। অচলাবস্থা চলতে থাকলে শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়বে।

প্রশাসনের পদক্ষেপ 
এ বিষয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান জানান, দুর্গাহাটা ডিগ্রি কলেজের অচলাবস্থার বিষয়ে প্রশাসন অবগত রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন, সাধারণত এডহক কমিটির কোনো শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার আইনি এখতিয়ার থাকে না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করা হবে। তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত কলেজের সংকট সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।