ভাঙ্গুড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩৫টি ঘর বিক্রির অভিযোগ, পরিত্যক্ত ঘরগুলো এখন অপরাধের আখড়া

জেলা প্রতিনিধিঃ পাবনা
২২ জুন, ২০২৬ ৮:০১ পিএম
শেয়ার করুন:
ভাঙ্গুড়ায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩৫টি ঘর বিক্রির অভিযোগ, পরিত্যক্ত ঘরগুলো এখন অপরাধের আখড়া

ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে সরকারের অন্যতম মানবিক উদ্যোগ ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’। কিন্তু পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় এ প্রকল্পের ঘর নিয়ে উঠেছে নানা অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও বিক্রির অভিযোগ। প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে সচ্ছল ব্যক্তিদের ঘর বরাদ্দ দেওয়ায় অনেকেই পরবর্তীতে তা চড়া দামে বিক্রি করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বেশ কিছু ঘর পরিত্যক্ত থাকায় সেগুলোতে মাদক, জুয়া ও অসামাজিক কার্যক্রমের আসর বসছে বলেও জানা গেছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ ধাপে ভাঙ্গুড়া উপজেলায় মোট ১০১টি আশ্রয়ণ ঘর নির্মাণ করা হয়। এসব ঘর নির্মাণে সরকারের ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৬১ লাখ ১০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের চর-ভাঙ্গুড়ায় ৪১টি, চর-ভাঙ্গুড়া পূর্বপাড়ায় ২১টি, অষ্টমনিষা ইউনিয়নের লামকান গ্রামে ৭টি, মণ্ডতোষ ইউনিয়নের টুনিপাড়ায় ৪টি, দিলপাশার ইউনিয়নের বেতুয়ান গ্রামে ৫টি, পার-ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নে ৩টি, খানমরিচ ইউনিয়নে ৫টি এবং ভাঙ্গুড়া পৌরসভায় ১৫টি ঘর রয়েছে। 

সম্প্রতি সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, নির্মিত ১০১টি ঘরের মধ্যে অন্তত ৩৫টি ঘর অবৈধভাবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। ঘরগুলো ৮০ হাজার থেকে শুরু করে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে বলে তথ্য মিলেছে। বর্তমানে এসব ঘরে বরাদ্দপ্রাপ্তদের পরিবর্তে ক্রেতা বা তাদের পরিবারের সদস্যরা বসবাস করছেন। 

স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যমতে, চর-ভাঙ্গুড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৬৪ নম্বর ঘরের জাহানারা, ৬৫ নম্বর ঘরের আনেছা খাতুন, ৬৬ নম্বর ঘরের রতনের মা, ৯৩ নম্বর ঘরের হোসেন চাঁদ, ৯৫ নম্বর ঘরের মজনুর প্রামাণিক, ৭০ নম্বর ঘরের সোহাগ হোসেন, ৭৭ নম্বর ঘরের জোহরা খাতুন, ১৭ নম্বর ঘরের আনোয়ারা খাতুন, ১৫ নম্বর ঘরের হাসি খাতুন এবং সবুরা খাতুনসহ অন্তত ৩৫ জন বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি তাদের ঘর বিক্রি করে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রকৃত ভূমিহীনদের বঞ্চিত করে অনিয়ম ও প্রভাব খাটিয়ে সচ্ছল ব্যক্তিদের এসব ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ফলে ঘর হস্তান্তরের পর তারা তা বিক্রি করে দেন।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, প্রকল্পের প্রায় ২৫টি ঘর দীর্ঘদিন ধরে ফাঁকা ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বসবাসের কোনো লোক না থাকায় এসব পরিত্যক্ত ঘর এখন অপরাধের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে কিংবা দিনে এসব ঘরে নিয়মিত জুয়া খেলা, মাদক সেবন ও নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। এতে এলাকার সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ফেরদৌস আলম জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণের সময় সরকারি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল। 

তবে ঘর বিক্রি ও পরিত্যক্ত ঘরের বিষয়ে ভাঙ্গুড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজানুর রহমান বলেন, "অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

একই বিষয়ে ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, "বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"

হতদরিদ্র ও গৃহহীন মানুষের জন্য সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পটির এমন বেহাল দশায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের দাবি, একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে যেন যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়, যাতে এই মহৎ প্রকল্পের প্রকৃত সুফল সাধারণ ও অসহায় মানুষ পেতে পারে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।