হাসিনার চুক্তি নিয়ে বিপাকে সরকার

অনলাইন ডেস্কঃ
২১ জুন, ২০২৬ ১:৩৮ পিএম
শেয়ার করুন:
হাসিনার চুক্তি নিয়ে বিপাকে সরকার

বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিতর্কিত সীমান্ত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক বাতিল করা নিয়ে নীতিগত জটিলতায় পড়েছে নবনির্বাচিত সরকার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এই ‘অসম’ চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নিলেও, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের আমলে এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। চুক্তিটি বহাল রাখা হবে নাকি বাতিল করা হবে, তা নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

সীমান্তের বর্তমান চিত্র ও চুক্তির পটভূমি
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার মোট ৪,১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে প্রায় ৩,২৭১ কিলোমিটারে ইতিমধ্যে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শেষ করেছে ভারত। ২০১০ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইনকে এক প্রকার উপেক্ষা করেই এই বেড়া নির্মাণ কাজ চালানো হয়। 

বর্তমানে বাকি ৮৮৫ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে ভারত জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। বিজিবি বা স্থানীয়রা এতে বাধা দিলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) শেখ হাসিনা সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতার দোহাই দিচ্ছে। 

১৯৭৫ সালের ‘বাংলাদেশ-ভারত যুগ্ম-সীমান্ত নির্দেশাবলি’ এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, উভয় দেশের শূন্যরেখার (জিরো লাইন) ১৫০ গজের মধ্যে কোনো ধরনের স্থায়ী বা প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত স্থাপনা নির্মাণে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, ২০১০ সালে তিনবিঘা করিডোর সংক্রান্ত একটি সমঝোতার আড়ালে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে শূন্যরেখাতেই কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার সুযোগ পায় ভারত। 

অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ ও বর্তমান স্থবিরতা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সীমান্তে বিএসএফ-এর জবরদস্তিমূলক কর্মকাণ্ড ও সীমান্ত হত্যা সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্ত এবং পরবর্তীতে কুড়িগ্রাম ও নওগাঁ সীমান্তে বিএসএফ আবারও জিরো লাইনে বেড়া দেওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি প্রবল বাধা দেয়। 

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছিলেন, পতিত সরকারের আমলে করা অসম সীমান্ত চুক্তিগুলো বাতিলের বিষয়ে ভারতকে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে সরকার পরিবর্তনের কারণে সেই সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

ভারতের অবস্থান
২০২৫ সালে সীমান্তে বেড়া নির্মাণ নিয়ে ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (পিআইবি) একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান ও মানবপাচার রোধে প্রোটোকল মেনেই তারা সীমান্ত সুরক্ষিত করছে। তবে জমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও বিজিবির আপত্তির কারণে কিছু অংশে এখনো বেড়া দেওয়া সম্ভব হয়নি। 

বিশেষজ্ঞদের অভিমত
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর মতে, বিগত সরকারের যেসব চুক্তি দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী, সেগুলো দ্রুত জনসমক্ষে প্রকাশ ও বাতিল করা উচিত। জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এই বিষয়ে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

সাবেক বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও ১৯৭৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী শূন্যরেখার ১৫০ গজের ভেতর কোনো স্থাপনা তৈরি করা অবৈধ। এই নিয়ম লঙ্ঘন করে কোনো সমঝোতা স্মারক সই হয়ে থাকলেও তার কোনো আন্তর্জাতিক কার্যকারিতা থাকে না এবং তা অবিলম্বে বাতিল করা উচিত।

সরকারের বক্তব্য
সীমান্ত নিয়ে বিগত সরকারের চুক্তি বাতিলে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে ও পর্যালোচনা করে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।