প্রতিমন্ত্রীর ছেলেদের নামে ২ ইউনিয়ন গণশুনানির কথা জানেন না সাধারণ মানুষ, নামের ‘প্রস্তাবকেরা’ যুবদল নেতা

অনলাইন ডেস্কঃ
১৮ জুন, ২০২৬ ১:২৩ পিএম
শেয়ার করুন:
প্রতিমন্ত্রীর ছেলেদের নামে ২ ইউনিয়ন গণশুনানির কথা জানেন না সাধারণ মানুষ, নামের ‘প্রস্তাবকেরা’ যুবদল নেতা

বগুড়ায় সদ্য ঘোষিত চারটি নতুন ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাড়ি ও দুই ছেলের নামে তিনটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। 

প্রশাসন দাবি করছে, যথাযথ গণশুনানির মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামতের ভিত্তিতেই এই নামগুলো চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালিয়ে এই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সাধারণ মানুষ এ ধরনের কোনো গণশুনানির বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন। এমনকি নতুন নামগুলোর প্রস্তাবক হিসেবে যাদের কথা বলা হচ্ছে, তাদের কয়েকজন স্থানীয় যুবদল নেতা।

বিতর্কিত নামকরণ ও পারিবারিক সংশ্লিষ্টতা
গত ১১ জুন বগুড়া জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে শিবগঞ্জ উপজেলার ৫টি এবং নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করে চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী:
১. শিবগঞ্জ উপজেলার নতুন ইউনিয়নটির নাম রাখা হয়েছে ‘মীরবাড়ী’—যা প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পৈতৃক নিবাস ‘মীরবাড়ী’র অনুকরণে।
২. মোকামতলা উপজেলার নতুন দুটি ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’। এই নাম দুটি প্রতিমন্ত্রীর দুই ছেলে যথাক্রমে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত ও মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
৩. অন্য ইউনিয়নটির নাম রাখা হয়েছে ‘স্বর্ণগ্রাম’, যা প্রতিমন্ত্রীর ভাইয়ের মেয়ে স্বর্ণালীর নামের সঙ্গে মিল রেখে করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংসদে প্রতিমন্ত্রীর ব্যাখ্যা ও আইনগত প্রশ্ন
বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ সংসদে এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দেন। তিনি দাবি করেন, এই নামকরণ সম্পূর্ণ ‘কাকতালীয়’। ভৌগোলিক কারণে এই নামগুলো রাখা হয়েছে—সীমান্তবর্তী হওয়ায় ‘সীমান্ত’ এবং দূরবর্তী হওয়ায় ‘দিগন্ত’ নাম রাখা হয়েছে। 

তবে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির নামে ইউনিয়নের নামকরণ করার সুযোগ নেই। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বিষয়টিকে অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক ও দৃষ্টিকটু বলে অভিহিত করেছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক নামে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামকরণের ঘটনাটি অত্যন্ত বিব্রতকর।

গণশুনানির দাবি বনাম মাঠের বাস্তব চিত্র
উপজেলা প্রশাসন ও নির্বাচন কর্মকর্তার পক্ষ থেকে মে মাসে বিভিন্ন এলাকায় গণশুনানির মাধ্যমে নাম চূড়ান্ত করার দাবি করা হলেও, স্থানীয় বাসিন্দারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন।

‘দিগন্ত’ ইউনিয়ন: ভরিয়া গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নামকরণের কোনো গণশুনানি হয়নি। এই নামের প্রস্তাবক ছিলেন দেউলী ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি শাহিনুর রহমান। তিনি স্বীকার করেছেন যে, বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে মাত্র ২০-২৫ জন দলীয় নেতা-কর্মীর উপস্থিতিতে এই নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল।
‘সীমান্ত’ ইউনিয়ন: সৈয়দপুর ইউনিয়নের হাবিবপুর বাজার এলাকার সাধারণ বাসিন্দারা কোনো গণশুনানির কথা শোনেননি। এই নামের প্রস্তাবকও ছিলেন সৈয়দপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ও ইউপি সদস্য বেলাল হোসেন।
‘মীরবাড়ী’ ইউনিয়ন: এই নামের প্রস্তাবক শফিকুল ইসলাম জানান, কোনো গণশুনানি নয়, বরং উপজেলা পরিষদে ডেকে নিয়ে তাঁর কাছ থেকে এই নামের প্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল।
‘স্বর্ণগ্রাম’ ইউনিয়ন: স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ঐতিহাসিক ‘দাড়িদহ’ নামে ইউনিয়নের নামকরণের। কিন্তু কোনো প্রকাশ্য আলোচনা ছাড়াই ‘স্বর্ণগ্রাম’ নাম দেওয়া হয়। প্রস্তাবক শিক্ষক বিমল কুমার রায় স্বীকার করেছেন, একটি বন্ধ কার্যালয়ে আড্ডার ছলে তিনি এই নাম প্রস্তাব করেছিলেন, যা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গণশুনানি ছিল না।

প্রশাসনের বক্তব্য
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জানান, প্রতিমন্ত্রীর ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) পাওয়ার পরেই নতুন ইউনিয়ন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং গণশুনানির জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে গণশুনানি আয়োজনের কোনো ছবি বা প্রমাণ গণমাধ্যমের কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি ওই কমিটি। অন্যদিকে জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান পুরো দায় উপজেলা প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে জানিয়েছেন, নামকরণের প্রস্তাব এসেছে উপজেলা পর্যায় থেকেই, এখানে জেলা প্রশাসনের সরাসরি কিছু করার ছিল না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গণশুনানির নামে কেবল দলীয় নেতা-কর্মীদের মতামত নিয়ে এবং প্রভাব খাটিয়ে প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক বলয়ের নামে এই নতুন ইউনিয়নগুলোর নামকরণ সম্পন্ন করা হয়েছে, যা সাধারণ জনগণের আকাঙ্খার পরিপন্থী।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।