কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম থেকে ফিরলেন আরও ৭৮ বাংলাদেশি

অনলাইন ডেস্কঃ
১৮ জুন, ২০২৬ ১১:৪৪ এএম
শেয়ার করুন:
কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম থেকে ফিরলেন আরও ৭৮ বাংলাদেশি

কম্বোডিয়ার বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম সেন্টার (প্রতারণা চক্রের আস্তানা) থেকে উদ্ধার হওয়া আরও ৭৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক অবশেষে দেশে ফিরেছেন। এ নিয়ে গত চার দিনে দেশটির বিভিন্ন স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে মুক্ত হয়ে মোট ২২১ জন বাংলাদেশি খালি হাতে দেশে ফিরে এলেন।

বুধবার (১৭ জুন) রাতে থাই এয়ারওয়েজের টিজি-৩৩৯ ফ্লাইটে ভুক্তভোগীরা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটির সহায়তায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ফেরত আসা প্রবাসীদের জরুরি খাবার ও নিজ নিজ বাড়ি পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।

চাকরির নামে নিয়ে গিয়ে 'বিক্রি'
ফেরত আসা এক ভুক্তভোগী তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে জানান, দালাল চক্র সরাসরি ভালো কোম্পানিতে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা নেয়। এরপর জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র দিয়ে তাঁকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁকে মাত্র এক মাসের ভিজিট ভিসা দেওয়া হয় এবং কোনো চাকরির ব্যবস্থা করা হয়নি। পরবর্তীতে সেখানকার রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধিরা অর্থের বিনিময়ে তাঁকে একটি সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেয়।

টর্চার সেলে বৈদ্যুতিক শক ও নির্মম নির্যাতন
আরেক ভুক্তভোগী জানান, স্ক্যাম সেন্টারে আটকে রেখে তাঁদের দিয়ে জোরপূর্বক বিভিন্ন অনলাইন প্রতারণার কাজ করানো হতো। কাজ করতে রাজি না হলে বা লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ হলে তাঁদের অন্ধকার টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার পাশাপাশি চলত অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন। সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই অবৈধ স্ক্যাম সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করলে চীনা চক্রের সদস্যরা পালিয়ে যায় এবং বাংলাদেশিরা সেখান থেকে মুক্তি পান।

কম্বোডিয়ায় চরম সংকটে হাজারো কর্মী
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন কর্মী চাকরি নিয়ে কম্বোডিয়ায় গিয়েছেন। তবে ফেরত আসাদের দাবি, ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে পাঠানো হলেও সেখানে হাজার হাজার বাংলাদেশি কর্মী কাজ না পেয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এর আগে গত ১২ জুন ৩৭ জন, ১৩ জুন ৫৪ জন এবং সবশেষ ১৭ জুন ৭৮ জন ভুক্তভোগী দেশে ফেরত আসেন। শুধু কম্বোডিয়াই নয়, চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটজন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আরও ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিককে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তাঁদেরও থাইল্যান্ডের সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক মিয়ানমারে নিয়ে পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে জিম্মি করা হয়েছিল।

সচেতনতা ও কঠোর আইনি ব্যবস্থার দাবি
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, "এটি মানবপাচারের অত্যন্ত ভয়াবহ একটি আধুনিক রূপ। কম্পিউটার বা কলসেন্টার অপারেটর পদে আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়। এরপর চাকরিপ্রার্থীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে উন্নত দেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে সাইবার প্রতারণা করতে বাধ্য করা হতো।"

তিনি আরও জানান, কম্বোডিয়া সরকারের অভিযানের কারণে এই বাংলাদেশিদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ইতিমধ্যে ফেরত আসা বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী দেশে মামলা করেছেন। পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত দালাল ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান। একই সাথে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় যাওয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।