শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্য দোলন

জালিস মাহমুদ, স্টাফ রিপোর্টার, পিরোজপুরঃ
Mar 13, 2026 - 19:16
Mar 13, 2026 - 19:16
শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্য দোলন

ঢাকার পলাশীর মোড় এলাকার ফুটপাতে খোলা আকাশের নিচে বসবাস বেশ কয়েকটি ছিন্ন মূল পরিবারের। সেই সব পরিবারের অনান্য সদস্যদের মতো বেড়ে উঠছে শিশুরাও। এসব শিশুদের জন্য নেই কোন শিক্ষার সুবিধা। শিক্ষার আলো থেকে দূরে সরে গিয়ে এইসব শিশুরা জড়িয়ে যাচ্ছে ভিক্ষা বৃত্তি, ছিনতাই বা নেশার মতো ভয়াবহ অপরাধের সাথে। এইসব শিশুদের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের শিক্ষার প্রতি উদাসীন। অথচ শিক্ষা অন্যতম মৌলিক অধিকার এ বিষয়ে অবিভাবকরা অসচেতন যদিও ল ফুটপাত বা বস্তিতে বেড়ে উঠা এই শিশুদের মধ্যেও রয়েছে সুপ্ত প্রতিভা। 

ঢাকার ডিএমপিতে কর্মরত পুলিশ সদস্য দোলন ছাত্র জীবন থেকেই কাজ করে যাচ্ছেন সমাজের পিছিয়ে পড়া অসহায় জনগোষ্ঠীর কল্যানে। তারই ধারাবাহিকতায় ডিএমপিতে যোগদানের পর তিনি নানান সেবামূলক কাজের পাশাপাশি ঢাকার পলাশীর মোড়ে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীর সহায়তায় চালু করেন মানবিক পাঠশালা।

২৬ জন পথশিশু নিয়ে যাত্রা শুরু এই মানবিক পাঠশালার। পুলিশের এই মানবিক সদস্যরা তাদের অবসর সময়ে ক্লাস নিয়ে থাকেন।

 এদিকে মানবিক পুলিশ দোলন তার চাকরীর শুরুটা হয় পার্বত্য জেলার বান্দরবনে। সেখানের দূগর্ম পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য শুরু করেন মানবিক পাঠশালা। প্রায় ৬৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বান্দরবানের সদর উপজেলার মুসলিম পাড়ায় শুরু করেন মানবিক পাঠশালাটি। 

সেই পাঠশালায় পড়ালেখা শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক পযার্য়ে পড়ালেখা করছে অনেক শিক্ষার্থী। পরবর্তীতে দোলন যেখানে বদলী হয়েছেন সেখানেই গড়ে তুলেছেন শিক্ষা বঞ্চিত শিশুদের জন্য এই মানবিক পাঠশালা। চট্টগ্রামের ঝাউতলা রেললাইনের পাশে বস্তিতে বসবাস করা শিশুদের জন্য এবং তার নিজ জেলা লক্ষীপুরেও তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন এই মানবিক পাঠশালা। 

এসব পাঠশালায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করানো পাশাপাশি বই,খাতা, কলম, ইউনিফর্ম, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য ব্রাশ, টুথপেষ্ট, নেইল কাটার ইত্যাদি বিতরন করা হয়। সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য মানবিক পাঠশালার এই কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন শিক্ষার আলো থেকে ঝরে পড়া এবং শিক্ষা বঞ্চিত এই শিশুদেরকে স্ব-শিক্ষিত ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে আমার এই প্রচেষ্টা। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশাপাশি তিনি কাজ করছেন স্বামী হারা বিধবা ও সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য। সম্প্রতি ঢাকার আজিমপুর এলাকায় রাস্তার ফুটপাতে দীর্ঘ তের বছর ধরে সেলাই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা কর্মোদ্যমী নারী কল্পনা রানী দাসের সেলাই মেশিনটি চুরি হয়ে যায় রাতের আধারে। বন্ধ হয়ে যায় তার রুটি রোজগারের পথ। আয়ের পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অসুস্থ স্বামী আর তিন সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেন কল্পনা রানী দাস। পুলিশ সদস্য দোলন তার বেতনের জমানো টাকা দিয়ে কল্পনা রানী দাসকে কিনে দেন একটি সেলাই মেশিন। ঘুড়ে দাঁড়ায় কল্পনা রানী দাস। ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের স্বামীহারা নারী রেনু বেগম জীবিকার তাগিদে ৮৫ বছর বয়সে দৈনিক ১২০ টাকা মজুরীতে ইট ভাঙ্গার কাজ করতেন। এদিকে মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলেকে নিয়ে মানবেতর দিন কাটায় রেনু বেগম। চলার পথে একদিন কথা হয় দোলনের সাথে। রেনু বেগম বলেন তার জীবনের কষ্টের কথা গুলো। দোলন তার বেতনের টাকা দিয়ে রেনু বেগমকে কিনে দেন একটি ভ্যান । ভ্যানটি ভাড়া দিয়ে রেনু বেগম দৈনিক ১৫০ টাকা পান। আর তা দিয়েই চলে রেনু বেগমের সংসার। ইট ভাঙ্গার মতো হাড় ভাঙ্গা খাটুনির কাজ করতে হয় না আর ৮৫ বছরের রেনু বেগমকে। এভাবে অসংখ্য অসহায় সুবিধা বঞ্চিত এবং স্বামীহারা বিধবা ও সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের কল্যানে বিরামহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছেন পুলিশের এই মানবিক সদস্য দোলন।

 পরিবার পরিজনহীন প্রবীণদের নিয়ে কাজ করার কথা বলতে গিয়ে দোলন জানান, লক্ষীপুর জেলার কমলনগর উপজেলার ০৬ নং পাটারীর হাট ইউনিয়নের খায়েরহাট এলাকার বাসিন্দা মো. কাদির মিয়া তার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে খুব মানবেতর দিন কাটাত।

কাদের মিয়ার স্ত্রী দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ঘরে প্যারালাইজডে আক্রান্ত হয়ে শয্যাসায়ী। উপার্জনক্ষম কোন ব্যক্তি না থাকায় খুব কষ্টে দিন কাটাতো তারা। এর উপর ট্রলার ডুবিতে স্বামী মারা যাওয়ায় তার ছোট মেয়ে দুই নাতনি নিয়ে আশ্রয় নেয় বাবার ঘরে। কাদির মিয়ার পলিথিন টাঙ্গানো ঘরটিতে বসবাস করত ০৫ সদস্য নিয়ে। বিধবা মেয়ে, দুই নাতনি ও প্যারালাইজড আক্রান্ত স্ত্রীকে নিয়ে খুব মানবেতর দিন কাটাতো কাদির মিয়া। যেখানে দুই বেলা খাবার জোটাতে হাত পাততে হতো মানুষের কাছে সেখানে ভালো ঘরে থাকা ছিল আকাশচুম্বী স্বপ্ন। পৈত্রিক ভিটা মাটিতে বসবাস করলেও ঘর করার সামর্থ্য ছিলো না কাদির মিয়ার। পুলিশ সদস্য মো. দোলন তার প্রতিবেশীদের মাধ্যমে কাদির মিয়া নিদারুন কষ্টের জীবনযাপনের কথা জানতে পেরে সৌদি প্রবাসী বন্ধু শাহিনের সহায়তায় একটি ঘর নির্মান করে দেয়। সেই সাথে দোলন কাদির মিয়ার সংসারে উপার্জনের লক্ষ্যে বিধবা মেয়ে আসমা বেগমকে সেলাই কাজ শেখানোর ব্যবস্থা করে এবং একটি সেলাই মেশিন ও কিছু কাটা কাপড় কিনে দেয়। অসুস্থ কাদির মিয়ার স্ত্রীর জন্য ব্যবস্থা করেন একটি হুইল চেয়ারের। পুলিশ সদস্য দোলনের মানবিকতায় বদলে যায় কাদিরের জীবন। 

কাদির মিয়া বলেন “ বাবা আমি জীবনে কখনও ভাবতে পারি নাই, আমি আপনার জন্য দোয়া করমু, আমিও খুশি, আমার আল্লাহও খুশি, শোকরিয়া”। 

কাদির মিয়ার স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বলেন “ ১২ বছর ধইরা অসুখে পইরা রইছি কেউ খবর নেয় নাই, বাইরে বের হইতে পারি নাই, চলার মতো এই গাড়িটা পাইয়া আমি অনেক খুশি, আমি আমনেগো জন্য দোয়া করমু, আমি অহন নিজে নিজে বের হইতে পারি গাড়িতে চড়ে, আমার অনেক ভালো লাগছে। আমনেগরে দোয়া করি”। 

পুলিশ সদস্য দোলন বলেন, ছোট্ট এই জীবনে চেষ্টা করেছি অসহায় মানুষের কল্যানে কাজ করার বাকী জীবনটাও করে যাবো ইনশাআল্লাহ। 

পুলিশের এই মানবিক সদস্য শুধু সমাজের পিছিয়ে অসহায় মানুষের জন্য নয় কাজ করেছেন পরিবেশ প্রকৃতি এবং জলবায়ু নিয়ে। পরিবেশ প্রেমী দোলন বান্দরবান পার্বত্য জেলা, চট্টগ্রাম, লক্ষীপুর এবং ঢাকায় পরিবেশ রক্ষায় রোপন করেছেন সাতাশ হাজার গাছের চারা। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন প্লাষ্টিক জাতীয় পণ্যের ব্যবহার কমিয়ে আনতে। এছাড়াও বান্দরবানে দোলন করোনাকালীন সময়ে জীবনের ঝুকি নিয়ে সেবা করেছেন করোনা আক্রান্তদের এবং পৌছে দিয়েছেন খাবার সামগ্রী।

এদিকে দোলনের এই মানবিক ও সমাজসেবা মূলক কাজের জন্য পেয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশ প্রধানের নিকট থেকে আইজিপি ব্যাজ ও বিভিন্ন জাতীয় সম্মাননা। 

দোলন বলেন, আমি স্বপ্ন দেখি ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত সমাজের যেখানে ভিক্ষাবৃত্তি আর পরনির্ভরশীলতা কমে প্রতিটি মানুষ হবে আত্মনির্ভরশীল। আর পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে পরিবেশদূষন বন্ধ করতে হবে, পরিবেশ রক্ষায় লাগাতে হবে গাছ।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow