বোরকা নিয়ে সংসদে সরকারি দলের এমপির আপত্তিকর বক্তব্য

অনলাইন ডেস্কঃ
১৫ জুন, ২০২৬ ১১:১৫ এএম
শেয়ার করুন:
বোরকা নিয়ে সংসদে সরকারি দলের এমপির আপত্তিকর বক্তব্য

জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক (বোরকা) নিয়ে সরকারি দলের একজন সিনিয়র এমপির ‘আপত্তিকর’ মন্তব্যে তুমুল হট্টগোল ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল রোববার (১৪ জুন) চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনা চলাকালে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির তৈরি হয়। কুমিল্লা-৬ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর এমন মন্তব্যের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক তীব্র প্রতিবাদ জানান বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। 

পরবর্তীতে বিতর্কিত মন্তব্যটি সংসদীয় রেকর্ড থেকে ‘এক্সপাঞ্জ’ (প্রত্যাহার) করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল এবং ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কথা না বলার জন্য একটি রুলিং জারি করেন। তবে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এই বক্তব্যকে 'বর্ণবাদী আচরণ' এবং 'অমার্জনীয় অপরাধ' হিসেবে আখ্যায়িত করে এর কড়া জবাব দিয়েছেন।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত: 
সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনাকালে মনিরুল হক চৌধুরী ‘জামায়াতকে চেনা কঠিন’ মন্তব্য করে ২০০১ সালের একটি ঘটনার অবতারণা করেন। তিনি জানান, তৎকালীন এক মন্ত্রীর দেওয়া দাওয়াতে বিরোধীদলীয় উপনেতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিলেন। মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, “ঢোকার পর দেখি ‘একটা কিছু হাঁটতেছে’। আমি বললাম—তাহের ভাই, ভাবী কই? উনি বললেন, এই যে। তখন বলি, আপনি যে বদলায়ে আনেন নাই এটা কেমনে বুঝব।” তাঁর এই মন্তব্যে সংসদে হাসির রোল পড়ে।

এর পরপরই তিনি বর্তমান সংসদের বিরোধীদলীয় নারী এমপিদের পোশাকের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “আমাদের হাউসে বোনেরা এমপি হয়ে এসেছেন... কিন্তু বুঝলাম না তো কারা আপনারা? ... আমরা এইদিকে (জামায়াতের নারী এমপিদের দিকে) দেখলে... কী আছে বুঝব না, এটা ঠিক না।”

সংসদে তীব্র প্রতিবাদ ও হইচই:  
মনিরুল হক চৌধুরীর এই মন্তব্যের পরপরই নারী সংসদ সদস্যসহ বিরোধী দলের সব সদস্য নিজ আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ ও হইচই শুরু করেন। ডেপুটি স্পিকার বারবার তাঁদের বসার অনুরোধ জানালেও হট্টগোল অব্যাহত থাকে। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ এ সময় উচ্চস্বরে এর প্রতিবাদ জানান।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত দেখে মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, “প্রতিবাদ করার কিছু নেই। আমি কাউকে ছোট করার উদ্দেশ্যে কিছু বলিনি। অতীতের একটি ঘটনার গল্প বলেছি মাত্র। তারপরও যদি কেউ ছোট হয়ে থাকেন, তবে আমি ক্ষমা চাইছি।”

ডেপুটি স্পিকারের রুলিং ও বক্তব্য এক্সপাঞ্জ: 
পরিস্থিতি শান্ত করতে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, “মাননীয় সংসদ সদস্য, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলা উচিত না।” এরপর তিনি মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্যের বিতর্কিত অংশটুকু সংসদীয় কার্যপ্রণালী থেকে এক্সপাঞ্জ করার ঘোষণা দেন। ডেপুটি স্পিকারের এই সিদ্ধান্তকে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানান বিরোধী দলের সদস্যরা।

পরবর্তীতে ডেপুটি স্পিকার একটি রুলিং দিয়ে বলেন, “আমরা সকলেই জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য। আমরা যদি নিজেদের শালীনতা ও মর্যাদা রক্ষা না করি, তবে জনগণের কাছে লজ্জিত হব। এই মহান সংসদ গণতান্ত্রিক কার্যক্রম পরিচালনার চারণক্ষেত্র। ভবিষ্যতে কেউ এখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না।”

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের কড়া জবাব:  
আসরের নামাজের বিরতির পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। বিতর্কিত অংশ এক্সপাঞ্জ করার জন্য ডেপুটি স্পিকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “উক্ত বক্তব্য সংসদীয় রীতিনীতি এবং আমাদের সাংবিধানিক অধিকারের সীমাকে চরমভাবে লঙ্ঘন করেছে। সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতার স্ত্রীকে নিয়ে এবং নারী এমপিদের পোশাক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে এ ধরনের হীন মন্তব্য করা অমার্জনীয় অপরাধ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সবার ব্যক্তিগত ও পোশাকের স্বাধীনতা রয়েছে। উনার এই বক্তব্য মূলত একটি বর্ণবাদী আচরণের বহিঃপ্রকাশ।” ভবিষ্যতে সংসদে এ ধরনের মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

পরবর্তীতে পানিসম্পদমন্ত্রী শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে ডেপুটি স্পিকার তাঁর আগের রুলিং পুনর্ব্যক্ত করে আর কাউকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে অধিবেশনের পরবর্তী কার্যক্রমে চলে যান।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।