তীব্র দাবদাহ ও পানিশূন্য কাপ্তাই হ্রদ: বিদ্যুৎ সংকট ও কর্মহীনতায় বিপর্যস্ত রাঙ্গামাটি
মাঝারি থেকে তীব্র দাবদাহে পুড়ছে রাঙ্গামাটি। এর প্রভাবে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় নজিরবিহীন বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই অঞ্চল। একদিকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন তলানিতে ঠেকেছে, অন্যদিকে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজারো মৎস্যজীবী। পর্যটননির্ভর এই জনপদ এখন কার্যত পর্যটকশূন্য, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চরম স্থবিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাঙ্গামাটি অঞ্চলে এখন তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। গরমে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়লেও পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন নেমে এসেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট ৫টি ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১টি ইউনিট সচল রয়েছে। এটি থেকে মাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যা কেন্দ্রের স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় একেবারেই নগণ্য। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় রাঙ্গামাটি ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে দিন-রাত দফায় দফায় লোডশেডিং হচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষা কার্যক্রমে।
কাপ্তাই হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ খাল ও উপখালগুলোতে নৌ-চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে পাহাড়ি কৃষিপণ্য পরিবহনে ব্যয় ও সময়—দুটোই বেড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পানিপথ সচল রাখতে স্থানীয় প্রশাসন খাল খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।
এরই মধ্যে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন রক্ষায় ২৫ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে কাপ্তাই হ্রদে শুরু হয়েছে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা। এই সময়ে মাছ ধরা, পরিবহন ও বিপণন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। ফলে জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের ওপর প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তার কথা জানানো হলেও, তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল বলে দাবি করছেন ভুক্তভোগীরা।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি কাপ্তাই এখন কার্যত পর্যটকশূন্য। তীব্র গরম, হ্রদের নাব্যতা সংকট এবং চরম বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে পর্যটকরা কাপ্তাই-বিমুখ হয়ে পড়েছেন। ফলে হ্রদকেন্দ্রিক ট্যুরিস্ট বোটের মালিক, হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় দোকানদাররা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। ব্যবসায়ীদের মতে, অনুকূল পরিবেশ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় পর্যটন খাতে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত। বৃষ্টি না হলে হ্রদের পানির স্তর বাড়বে না, আর পানি না বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া সম্ভব নয়।
প্রকৃতি, অর্থনীতি ও জীবিকার এমন চতুর্মুখী সংকট কাটিয়ে জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে এখন কেবলই বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টির দিকে চেয়ে আছেন কাপ্তাইয়ের সাধারণ মানুষ।
What's Your Reaction?
রিপণ মারমা, কাপ্তাই প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটিঃ