কাগজে-কলমে ৫৯ শ্রমিক, বাস্তবে ভেকু দিয়ে চলছে খাল খনন

অনলাইন ডেস্কঃ
১৪ জুন, ২০২৬ ১০:৫১ এএম
শেয়ার করুন:
কাগজে-কলমে ৫৯ শ্রমিক, বাস্তবে ভেকু দিয়ে চলছে খাল খনন

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় সরকারি ‘খাল খনন ও সংস্কার’ প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের দিয়ে খননকাজ করানোর কথা থাকলেও, বাস্তবে কোনো শ্রমিকের উপস্থিতি ছাড়াই এস্কেভেটর (ভেকু) মেশিন দিয়ে তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করা হচ্ছে। আরও অভিযোগ উঠেছে, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী না হয়েও পুরো প্রকল্পের অর্থ লেনদেন ও তদারকি করছেন বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) এক নাইট গার্ড।

বরাদ্দ ও প্রকল্প বিবরণী
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারা দেশে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল খনন, পুনঃখনন ও সংস্কারের জন্য ৪২০ কোটি ৮৮ লাখ ১৯ হাজার ৭৬৮ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের আওতায় গাইবান্ধার সাতটি উপজেলায় মোট ১৩টি খাল সংস্কারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে সাঘাটা উপজেলায় রয়েছে দুটি খাল। এর একটি হলো পদুমশহর ইউনিয়নের ‘দাতিয়া খাল’ (বরাদ্দ ২৫ লাখ ৭৯ হাজার ১৪৭ টাকা) এবং অপরটি কামালের পাড়া ইউনিয়নের ‘কৈচড়া খাল’ (বরাদ্দ ২৩ লাখ ২১ হাজার ৬৬৩ টাকা)।

কাগজে-কলমে শ্রমিক, বাস্তবে ভেকু
সরেজমিনে পদুমশহর ইউনিয়নের ‘দাতিয়া খাল’ খনন প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, দুটি ভেকু মেশিন দিয়ে পুরোদমে খননকাজ চলছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পটিতে ৫৯ জন শ্রমিকের কাজ করার কথা থাকলেও মাঠে দেখা গেছে মাত্র ৩ জন শ্রমিককে। মাত্র পাঁচ দিনেই ভেকু দিয়ে প্রকল্পের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কাজ শেষ করা হয়েছে। 

ভেকু চালক নজরুল ইসলাম জানান, দৈনিক ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা চুক্তিতে তারা কাজ করছেন এবং এই কাজের বিল পরিশোধ করছেন জাহিদ নামের এক ব্যক্তি। অন্যদিকে মাঠে কর্মরত শ্রমিক মুন্না ও মাহাবুর জানান, তারা মাত্র ৩ জন দৈনিক ৮০০ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন। সেখানে সরকারি তালিকায় থাকা কোনো শ্রমিক উপস্থিত নেই। 

পিআইও’র কাজ করছেন বিআরডিবি’র নাইট গার্ড
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্পের টাকা লেনদেন ও দেখভালের দায়িত্বে থাকা জাহিদ নামের ওই যুবক সাঘাটা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) অফিসের কেউ নন। তিনি মূলত উপজেলা বিআরডিবি অফিসের নাইট গার্ড (নৈশপ্রহরী) হিসেবে কর্মরত। স্থানীয়দের অভিযোগ, জাহিদ নৈশপ্রহরী হলেও সাঘাটা পিআইও কর্মকর্তার ছায়া হয়ে কাজ করেন এবং সব ধরনের আর্থিক লেনদেন তদারকি করেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহিদ বলেন, "আমি কোনো অফিসার নই। স্যার (পিআইও) আমাকে যা করতে বলেন, আমি শুধু সেটাই করি।"

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির বক্তব্য
প্রকল্পের এই অব্যবস্থাপনা নিয়ে কমিটির সদস্যদের মধ্যেই দেখা গেছে সমন্বয়ের অভাব। কমিটির সদস্য ও স্থানীয় জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম জানান, কমিটির সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তাকে না জানিয়েই খননকাজ শুরু করা হয়েছে। তিনি এর সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।

পদুমশহর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য মৌসুমি বেগম বলেন, তিনি শ্রমিকের তালিকা চেয়ারম্যানের কাছে জমা দিয়েছেন, তবে ভেকু দিয়ে কাজ করানোর বিষয়টি তার জানা নেই। 

অবশ্য প্রকল্প কমিটির সদস্য সচিব ও ইউপি সদস্য রোসার আলী ভেকু ব্যবহারের কথা স্বীকার করে বলেন, "শ্রমিক তালিকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তাই আপাতত ভেকু দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে।" তবে প্রকল্পের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মফিজুল হক দাবি করেছেন, তিনি ভেকু ব্যবহারের বিষয়ে কিছুই জানেন না।

প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে সাঘাটা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মেহেদী হাসান বলেন, "প্রাথমিকভাবে ভেকু দিয়ে খালের তলদেশ সমান করা হচ্ছে। শ্রমিক তালিকা চূড়ান্ত হলে তাদের দিয়ে বাকি কাজ ও ফিনিশিং করানো হবে।"

সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশরাফুল কবির জানান, "কাজটি পিআইও অফিস ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ যৌথভাবে করছে। সুনির্দিষ্ট কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।