নোয়াখালীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি: আতঙ্কে ৩৮ লাখ ৮৬ হাজার মানুষ

রিপন মজুমদার, জেলা প্রতিনিধি, নোয়াখালিঃ
১১ জুন, ২০২৬ ৪:৫১ পিএম
শেয়ার করুন:
নোয়াখালীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি: আতঙ্কে ৩৮ লাখ ৮৬ হাজার মানুষ

নোয়াখালীতে আইনশৃংখলার চরম অবনতি ঘটেছে। এতে আতঙ্কে দিন কাটছে ৩৮ লাখ ৮৬ হাজার মানুষ। খুন, ধর্ষণ, মাদক, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যু, কিশোর গ্যাংয়ের দাঙ্গা-হাঙ্গামা নিত্য ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এরমধ্যে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে একাধিক হত্যাকান্ড জমনে অতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। জেলার সোনাইমুড়ী, সুধারাম ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা বেগমগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি আলোচিত ঘটনা ঘটে।

জেলা পুলিশ, র‌্যাব, জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সহ (ডিএনসি) বিভিন্ন আইনশৃংখলা বাহিনীর নানামুখী তৎপরতা দৃশ্যমান থাকলেও কোনো ভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না অপরাধ। একের পর এক অপরাধমূলক ঘটনায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। সূত্রগুলো বলছে, গত কয়েক সপ্তাহে জেলায় খুন, গুলি, প্রকাশ্য চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এবং মাদক ব্যবসায়ীদের উৎপাত আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার, গুরুত্বপূর্ন এলাকাগুলোতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা দলবেঁধে মহড়া দিচ্ছে, যার ফলে সাধারণ পথচারী ও শিক্ষার্থীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। একই সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মাদক বিক্রি ও সেবন, যা তরুণ সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এরই মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সাথে বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ, হামলা ঘটনাও ঘটেছে। ঘটনা সামাল দিতে না পারায় সুধারাম মডেল থানার ওসিকে ইতিমধ্যে অপসারণ করা হয়েছে। রাজনৈতিক এই সহিংসতার জের ধরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিনিয়ত উত্তেজনা বিরাজ করছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে সাধারণ জনজীবনে। সম্প্রতি ব্যবসা প্রতিষ্টানে ক্যাশ বক্স থেকে জোর পূর্বক টাকা নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ব্যবসায়ীরা আতংকে আছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই নাজুক অবস্থা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নোয়াখালী পৌরসভার বাসিন্দা মো. ইলিয়াস হোসেন জানান: "পুলিশ ও প্রশাসনের গাড়ির সাইরেন শোনা গেলেও বাস্তবে অপরাধ দমনে তাদের কঠোর ভূমিকা থাকা লক্ষনীয় নয়। মাদককে কেন্দ্র করে বর্তমানে জেলায় গড়ে উঠেছে বিশাল শাক্তিশালি সিন্ডিকেট। সাধারণ মানুষ মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। মাদক কারবারিদের সাথে কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা যোগসূত্র রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। 

চৌমুহনী পৌরসভার বাসিন্দা শামসুল হক ও ইসমাইল হোসেন বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে বেগমগঞ্জের মুজাহিদপুর, চৌমুহনীর পৌর গনিপুর, হাজিপুরসহ বিভিন্ন স্থানে মাদক কারবারিদের বাড়ি ঘরে হানা দিয়ে মারধর ও ভাংচুর করে নিজেরাই মাদক প্রতিহতের চেষ্টা করছে। অনেক সময় বাঁধা দেওয়ায় মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী হামলারও শিকার হচ্ছেন অনেক মানুষ। এ নিয়ে থানায় অভিযোগ দিলে সেই অভিযোগ তদন্তে গড়িমসি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের মাদক কারাবারিদের পক্ষ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ আতংকে ভুগছেন। এছাড়া ও রাতের বেলায় টহলরত অবস্থায় কিছু অসাধু পুলিশ মাঠি খেকো, বিভিন্ন মাদক বিক্রয় এলাকায় অবস্থান করে অপরাধের সাথে জড়িতদের টাকার বিনিময়ে ছাড় দিচ্ছেন। এসব কারনে অপরাধীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

 সম্প্রতি সাধারন মানুষ জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কায় দিনাতিপাত করছে। এদিকে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে জেলায় ৪টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে সোনাইমুড়ীর কাশিপুরে ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন, চাঁদা না দেওয়ায় বেগমগঞ্জের খানপুরে কিশোর গ্যাং এর হামলায় রাকিব, মাদক ব্যবসা ও জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে সুধারামের দাদপুরে কিশোর গ্যাং এর হামলায় ব্যবসায়ী কামাল হোসেন, বেগমগঞ্জের শরিফপুরে পূর্ব শত্রুতার জেরে সাদ্দাম হোসেন হত্যাকান্ডের পর জেলার আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রনে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়াও বেগমগঞ্জের বাংলাবাজার থেকে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্রসহ রাহিম নামের যুবক গ্রেফতার, হাজিপুর প্রকাশ্যে ওমর ফারুক নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যার চেষ্টার ঘটনায় নতুন করে আলোচনার জম্ম নিয়েছে। আইনশৃংখলা পরিস্থিতির এমন অবনতিতে জেলা বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

এলাকাবাসীর দাবি, শুধু নিয়মিত টহল নয়, বরং সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কিশোর গ্যাংয়ের আশ্রয়দাতা, চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ এবং সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হোক। অন্যথায় জেলার সার্বিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল। এই বিষয়ে জানতে চাইলে নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, অপরাধ দমনে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ইতিপূর্বেও হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং জনমনে স্বস্তি ফেরাতে দ্রুতই আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।