উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয় ও দুর্নীতি রোধে কঠোর পদক্ষেপ: সংসদ সদস্যদের বিশেষ বরাদ্দ বাতিল করে নতুন তদারকি সেল

অনলাইন ডেস্কঃ
৯ জুন, ২০২৬ ৯:২৮ পিএম
শেয়ার করুন:
উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয় ও দুর্নীতি রোধে কঠোর পদক্ষেপ: সংসদ সদস্যদের বিশেষ বরাদ্দ বাতিল করে নতুন তদারকি সেল

জাতীয় বাজেটের অর্থ অপচয় রোধ এবং উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্থানীয় উন্নয়নের নামে সংসদ সদস্যদের (এমপি) দেওয়া বিশেষ থোক বরাদ্দ বাতিল করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই সিদ্ধান্ত সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অন্তত ১২০০ থেকে ১৪০০ কোটি টাকার অপচয় ও অনিয়ম রোধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বন্ধ হবে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ।

অতীতের চিত্র ও বরাদ্দের অপব্যবহার: 
বিগত সময়গুলোতে সংসদ সদস্যরা তাদের নিজ নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নের জন্য বার্ষিক ৫ কোটি টাকা হিসেবে ৫ বছরে মোট ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা বিশেষ থোক বরাদ্দ পেতেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই এই বরাদ্দের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হতো না। স্থানীয় পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় কালভার্ট, সেতু কিংবা যত্রতত্র সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব পাস করিয়ে পরবর্তীতে পছন্দের ঠিকাদারকে নামমাত্র মূল্যে কাজ দিয়ে বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের। এর ফলে গ্রামীণ জনপদে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় সেতু বা ধানি জমির মাঝখান দিয়ে জনমানবহীন সড়ক নির্মাণের মতো নজিরবিহীন অপচয়ের চিত্র দেখা যেত।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নতুন তদারকি সেল:
উন্নয়ন খাতের এই অব্যবস্থাপনা ও অর্থের অপব্যবহার দূর করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি নতুন ও কেন্দ্রীভূত (Centralized) নিয়ম চালু করা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা আর সরাসরি কোনো থোক বরাদ্দ পাবেন না। এর পরিবর্তে তারা নিজ এলাকার প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কাজের একটি চাহিদাপত্র বা তালিকা তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ সেলে জমা দেবেন। 

উক্ত বিশেষ সেল প্রতিটি প্রস্তাবের যৌক্তিকতা, গুরুত্ব ও মাঠপর্যায়ের প্রয়োজনীয়তা কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করবে। যাচাই শেষে প্রকল্পের অর্থ সরাসরি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হবে এবং বাস্তবায়নের দায়িত্বও থাকবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওপর। এছাড়া কাজের গুণগত মান ও অগ্রগতি নিশ্চিত করতে প্রতি মাসে অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দিতে হবে।

রাজনীতি ও নির্বাচনে ইতিবাচক প্রভাব:  
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে নির্বাচনী রাজনীতিতে এক বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে কেবল অনৈতিক আর্থিক সুবিধা অর্জন বা ঠিকাদারি ব্যবসা বাগানোর উদ্দেশ্যে সংসদ সদস্য হওয়ার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, তা অনেকটাই হ্রাস পাবে। ফলে সৎ এবং জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিদের রাজনীতিতে এগিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হবে। 

বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও সতর্কতা:
এই সংস্কারমুখী উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা কিছু সতর্কতার কথাও উল্লেখ করেছেন:

১. তদারকি সেলের স্বচ্ছতা: সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কেন্দ্রীয় এই বিশেষ সেলটি নিজেই যেন কোনো ধরনের অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতির কেন্দ্রে পরিণত না হয় (প্রচলিত অর্থে ‘সর্ষের ভেতরের ভূত’ না হয়ে ওঠে), তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।  
২. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়ানো: কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্তের কারণে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত ও জরুরি উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যেন লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে থমকে না যায়।  
৩. নিরপেক্ষতা বজায় রাখা: রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে কোনো সংসদ সদস্যের এলাকাকে যেন অনৈতিক অগ্রাধিকার দেওয়া না হয়। 

এই চ্যালেঞ্জগুলো দৃঢ়তার সাথে মোকাবেলা করে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের উন্নয়ন খাতে দীর্ঘমেয়াদী স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।