প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী ফয়েজ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ দুদকের

অনলাইন ডেস্কঃ
১০ জুন, ২০২৬ ১১:০৬ এএম
শেয়ার করুন:
প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী ফয়েজ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ দুদকের

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ফাইভ-জি প্রকল্পে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং তদন্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। 

দুদকের পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি অনুসন্ধানকারী দল দীর্ঘ তদন্ত শেষে সম্প্রতি সংস্থার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এই তদন্ত প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছে। দুদকের নতুন কমিশন গঠিত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে মামলাটি রুজু করা হবে বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। 

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে সাবেক এই বিশেষ সহকারীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাপক অনিয়ম ও সরকারি কাজে প্রভাব বিস্তারের সুনির্দিষ্ট তথ্য উঠে এসেছে।

বিতর্কিত প্রকল্প ও প্রেক্ষাপট
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ফাইভজি উপযোগীকরণে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি মূলত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হাতে নেওয়া হয়েছিল। তবে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় একপর্যায়ে প্রকল্পটি স্থগিত হয়ে যায়। 

গত বছরের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। তিনি প্রথমে প্রকল্পটি চালুর উদ্যোগ নিলেও পরবর্তীতে দুর্নীতির বিষয়টি জানতে পেরে পিছু হটেন। এরপর ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এই বিভাগের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে পুনরায় বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু হয়।

বাতিল আদেশ পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা
চুক্তি অনুযায়ী বিটিসিএলের ওই প্রকল্পের ‘ফ্যাক্টরি ফিজিক্যাল প্রি-অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট’ (FPAT) সম্পন্ন না হওয়ায় মালামাল জাহাজীকরণ এবং এলসির মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া আটকে ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব দুর্নীতির অভিযোগ ও দুদকের চলমান তদন্তের বিষয়টি গোপন রেখে পূর্বে বাতিল হওয়া একটি সরকারি আদেশ পুনরায় কার্যকরের জন্য প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে প্রস্তাব পাঠান। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বিতর্কিত চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েকে এলসির বিপরীতে অর্থ পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। তবে প্রধান উপদেষ্টা ওই প্রস্তাবে অনুমোদন দেননি।

দুদকের তদন্তে সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগ
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ)-২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর)-২০০৮ লঙ্ঘনের অভিযোগে বিটিসিএলের এই প্রকল্প নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছিল। অনুসন্ধান চলাকালীনই গত ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, তদন্ত চললেও মান যাচাই পরীক্ষা (FPAT) সম্পন্ন করার উদ্যোগ বন্ধ রাখা হবে না। 

শুধু চিঠিতেই নয়, ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব নিজে সরাসরি তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মৌখিক অনুমোদন আদায়ের চেষ্টা করেন। তবে তৎকালীন দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত ফিরতি চিঠিতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তদন্তাধীন অবস্থায় প্রকল্পটি চালিয়ে নেওয়া আইনের পরিপন্থী হবে। 

এর পরেও গত বছরের ২২ জুন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব সরকারি লেটারহেড প্যাড ব্যবহার করে দুদক চেয়ারম্যানকে আরেকটি চিঠি পাঠান। দুদক মনে করছে, এই চিঠির উদ্দেশ্য ছিল দুদকের স্বাধীন অনুসন্ধান কার্যক্রমকে প্রভাবিত ও বাধাগ্রস্ত করা, যা স্পষ্টত আইনের লঙ্ঘন।

স্বার্থের সংঘাত ও বিতর্কিত চীন সফর
গত বছরের মে মাসে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের একটি চীন সফর নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দুদক। সরকারি আদেশ অনুযায়ী, ৬ থেকে ১০ মে অনুষ্ঠিত এই সফরের যাবতীয় ব্যয় বহন করেছিল ‘চাইনিজ এন্টারপ্রাইজেস অ্যাসোসিয়েশন মেম্বার্স ইন বাংলাদেশ’ (সিইএবি)। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিটিসিএল প্রকল্পের কার্যাদেশ পাওয়া বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান ‘হুয়াওয়ে’ ওই অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম সদস্য। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে এমন সফরকে বড় ধরনের ‘স্বার্থের সংঘাত’ (Conflict of Interest) হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিশন।

যে সব ধারায় মামলার সুপারিশ
দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের এসব কর্মকাণ্ড পেশাগত অসদাচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা ও সরকারি ক্ষমতার অপপ্রয়োগের শামিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪০৯ (সরকারি কর্মচারী কর্তৃক বিশ্বাসভঙ্গ), ৪২০ (প্রতারণা) ও ৫১১ ধারার পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় মামলা করার জোর সুপারিশ করা হয়েছে।

ফয়েজ তৈয়্যবের বক্তব্য
তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব গণমাধ্যমকে বলেন, "আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলতে পারি, আমি এক টাকারও দুর্নীতি করিনি।" তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেছেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।