ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভে সহিংসতা, গ্রেপ্তার ১২০০; আহত দেড় শতাধিক পুলিশ

অনলাইন ডেস্কঃ
১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২:২১ পিএম
শেয়ার করুন:
ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভে সহিংসতা, গ্রেপ্তার ১২০০; আহত দেড় শতাধিক পুলিশ

ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ দশা, শিক্ষক সংকট এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে চলমান আন্দোলন চরম সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এ বিক্ষোভ ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে আনতে কর্তৃপক্ষ অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। শনিবার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে প্রায় দেড় শতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার ফ্রান্সজুড়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। রাজধানী প্যারিসসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। বিপরীতে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর, বিভিন্ন ভবন ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং দোকানপাটে ব্যাপক লুটপাট চালায়।

রণক্ষেত্রে পরিণত প্যারিসসহ একাধিক শহর  
প্যারিসে বিকেলের শান্তিপূর্ণ মিছিলটি সন্ধ্যার দিকে সহিংস রূপ নেয়। শহরের প্রাণকেন্দ্র প্লাস দ্য লা রিপাবলিকসহ আশপাশের এলাকায় বেশ কয়েকটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং দোকানপাটে লুটপাট চালানো হয়। আগুনে অন্তত একটি রেস্তোরাঁ সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

সহিংসতার আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে ফ্রান্সের অন্যান্য শহরেও:
লিমোজ: শহরের ঐতিহ্যবাহী সিটি হলে আগুন দেওয়া হলে ভবনটির ছাদের একাংশ ধসে পড়ে।  
লিয়ঁ: ঐতিহাসিক পর্যটন দপ্তর ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, যাকে শহরটির মেয়র এক ‘ট্র্যাজেডি’ বলে উল্লেখ করেছেন।  
সাঁ-এতিয়েন: শহরের মেয়র জানান, সংঘর্ষের সময় একটি গ্রেনেড বিস্ফোরণে এক তরুণের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।  
লিল ও গ্রেনোবল: লিল শহরে অ্যাপলের একটি শোরুম ভেঙে লুটপাট চালানো হয়। অন্যদিকে গ্রেনোবলে মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা একটি পর্যটকবাহী ছোট ট্রেন ছিনতাই করে দাঙ্গা পুলিশের ওপর তুলে দেওয়ার চেষ্টা করে। 

আন্দোলনের নেপথ্য কারণ
ফ্রান্সের ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ‘লিসে’ (Lycée) নামে পরিচিত। সেখানে তীব্র শিক্ষক-কর্মী সংকট ও ভগ্নপ্রায় অবকাঠামোর প্রতিবাদে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। 

পরবর্তীতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষোভ যোগ হওয়ায় আন্দোলনটি দেশব্যাপী গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেয় বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন এবং ২০১৮ সালের বহুল আলোচিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ (হলুদ জ্যাকেট) আন্দোলনের কর্মীরা।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া একাধিক তরুণ জানান, দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানিয়েও কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম নিয়েছে।

নির্বাচনী সমীকরণে রাজনৈতিক উত্তাপ
সামনে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থাকায় এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। 

বামপন্থী দল ‘লা ফ্রঁস আঁসুমিজ’-এর নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁ সরাসরি বিক্ষোভে যোগ দিয়ে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের সমালোচনা করেন, তবে একই সঙ্গে লুটপাটেরও নিন্দা জানান। মেলঁশোঁর এমন অবস্থানের কড়া সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু বলেন, “আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করা হচ্ছে। সহিংসতার মাধ্যমে কাউকে রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়া হবে না।”

অন্যদিকে, উগ্র ডানপন্থী নেতা মারিন লে পেনের দাবি—শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক ক্ষোভকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে চরম বামপন্থীরা দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সহিংসতায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করার ঘোষণা দিয়েছেন।

আশ্বাস সত্ত্বেও কাটেনি অসন্তোষ  
পরিস্থিতি শান্ত করতে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার গেফ্রে সম্প্রতি তিন হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা দেন। তবে এ ঘোষণায় শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে সাময়িকভাবে রাজপথ খালি করা গেলেও দীর্ঘদিনের শিক্ষা সংকট সমাধান ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ফ্রান্সে এই অসন্তোষের আগুন সহজে নিভবে না।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।