স্ত্রীসহ ৮ স্বজনকে হারিয়ে নির্বাক আশিক, জানালা দিয়ে বাঁচলেন প্রাণে

অনলাইন ডেস্কঃ
১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ৬:১৭ পিএম
শেয়ার করুন:
স্ত্রীসহ ৮ স্বজনকে হারিয়ে নির্বাক আশিক, জানালা দিয়ে বাঁচলেন প্রাণে

চোখের সামনে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা, চারদিকে কালো ধোঁয়া আর বাঁচার জন্য পর্যটকদের বুকফাটা আর্তনাদ। কোনো উপায় না পেয়ে বাঁচার শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনতলার জানালা দিয়ে নিচে লাফ দেন আশিকুল ইসলাম আশিক। অলৌকিকভাবে নিজের প্রাণ বাঁচাতে পারলেও হারিয়েছেন স্ত্রীসহ পরিবারের বাকি আট সদস্যকে। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর স্বজন হারানোর তীব্র শোকে এখন নির্বাক হয়ে পড়েছেন তিনি। 

শনিবার সকালে ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় অবস্থিত বাঁশ ও কাঠ দিয়ে নির্মিত তিনতলা ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে’ এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে তিন শিশুসহ অন্তত ১০ জন পর্যটক নিহত হয়েছেন এবং দগ্ধ হয়েছেন আরও ছয়জন।

স্বজনহারা আশিকুল ইসলাম জানান, ছুটি কাটাতে তিনি, তাঁর স্ত্রী এবং স্ত্রীর পরিবারের সদস্যসহ মোট নয়জন ওই রিসোর্টে উঠেছিলেন। আগুন ছড়িয়ে পড়লে তিনি জানালা দিয়ে লাফিয়ে প্রাণে রক্ষা পান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, *“আমি তিনজনের মরদেহ হাতে পেয়েছি। কিন্তু বাকি ছয়জনকে জীবিত বা মৃত—এখনো খুঁজে পাইনি।”*

যেভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে রিসোর্টটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি হওয়ায় মুহূর্তের মধ্যেই পুরো তিনতলা ভবনটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও নির্বাপণ কাজ শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন জানান, ঘটনাস্থল থেকে প্রথমে ছয়টি এবং দুপুরে আরও চারটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এতে অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ জনে। নিহতদের মধ্যে তিন শিশু রয়েছে।

নিহত ও আহতদের পরিচয়
নিহত ১০ জনের মধ্যে সাতজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তাঁরা হলেন:
ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), বনশ্রী, ঢাকা
মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), বনশ্রী, ঢাকা
লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), খিলগাঁও, ঢাকা
নাফিসতা মীম (২৭), খিলগাঁও, ঢাকা
ফারিহা কবির (৩৩), চুয়াডাঙ্গা
ফায়িজান আহম্মেদ (৫), চুয়াডাঙ্গা
নাসরিন আক্তার মুক্তা, আশুলিয়ার ‘স্বপ্ন বিলাস’ স্কুলের শিক্ষিকা (ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতির স্ত্রী)।

বাকি তিনজনের মরদেহ ও পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। 

অগ্নিকাণ্ডে গুরুতর আহত ছয়জনকে উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতরা হলেন—মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) এবং সামিদা (৩২)।

পর্যটকদের উপস্থিতি
রিসোর্টটিতে মোট নয়টি কক্ষ ছিল। শুক্রবার রাতে তিনটি কক্ষের পর্যটকরা চেকআউট করে চলে যান। বাকি ছয়টি কক্ষে অবস্থান করছিলেন মোট ১৬ জন পর্যটক। শনিবার ভোরে পাঁচ থেকে ছয়জন পর্যটক প্রাতর্ভ্রমণসহ বিভিন্ন কাজে বাইরে বের হওয়ায় তারা রক্ষা পান। বাকিরা ভেতরে আটকা পড়ায় এই মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হন।

অগ্নিনিরাপত্তাহীনতা ও তদন্ত
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে মারাত্মক অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানান, রিসোর্টটির কোনো অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। এ কারণে চলতি বছরের জুন মাসে প্রতিষ্ঠানটিকে সতর্কও করা হয়েছিল। 

তিনি আরও জানান, ভবনটির নিচতলায় রেস্তোরাঁর রান্নাঘর এবং ওপরের তলাগুলোতে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। রান্নাঘর বা গ্যাস সিলিন্ডার অথবা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, ঘটনার পরপরই রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের সবাই গা-ঢাকা দিয়েছে। অবহেলাজনিত কোনো কারণ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।