অন্য জায়গায় বাসা ভাড়া নিয়ে বিয়ে দিতে হয় ময়লাখোলার মেয়েদের

অনলাইন ডেস্কঃ
৯ জুন, ২০২৬ ১১:৪৭ এএম
শেয়ার করুন:
অন্য জায়গায় বাসা ভাড়া নিয়ে বিয়ে দিতে হয় ময়লাখোলার মেয়েদের

বরিশাল নগরীর একপাশে গড়ে উঠেছে আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা; আর ঠিক পাশেই উন্মুক্ত স্থানে প্রতিদিন জমা হচ্ছে শত শত টন বর্জ্য। তীব্র দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব, বিষাক্ত ধোঁয়া আর চরম পরিবেশ দূষণের মধ্যে বছরের পর বছর মানবেতর জীবনযাপন করছেন নগরীর কাউনিয়া পুরানপাড়া এলাকার হাজারো মানুষ। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, কেবল দুর্গন্ধের কারণে এই এলাকায় কেউ আত্মীয়তা করতে চায় না। বাধ্য হয়ে পরিবারের মেয়ে বা বোনের বিয়ে দিতে অন্য এলাকায় বাসা ভাড়া নিতে হচ্ছে অনেককে।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) একমাত্র ডাম্পিং স্টেশন এটি, যা স্থানীয়দের কাছে 'ময়লাখোলা' নামেই বেশি পরিচিত। জানা যায়, ২০০২ সালে নগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউনিয়া পুরানপাড়ায় প্রায় ছয় একর জমি অধিগ্রহণ করে এটি স্থাপন করা হয়। ২০০৪ সাল থেকে এখানে নগরীর সব ওয়ার্ডের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। প্রায় ৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই নগরীতে ছয় লাখ মানুষের বসবাস। প্রতিদিন এই শহর থেকে উৎপন্ন হওয়া প্রায় ২০০ টন গৃহস্থালি বর্জ্যের শেষ ঠিকানা এই ডাম্পিং স্টেশন। দীর্ঘ ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও এর আধুনিকায়ন বা স্থানান্তরের কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মাঝে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল এলাকাজুড়ে পলিথিন, প্লাস্টিক, কাগজ আর খাবারের উচ্ছিষ্টের পাহাড় জমে আছে। ডাম্পিং স্টেশনের মাত্র ৪০ গজ দূরেই কাউনিয়া হাউজিং প্রকল্প, যেখানে অন্তত ৫০০ পরিবারের বাস। এ ছাড়া আশপাশে আরও প্রায় তিন হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে। পাশেই রয়েছে স্কুল-কলেজসহ ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ১০-১২টি মসজিদ। বর্জ্যের তীব্র দুর্গন্ধে এসব এলাকায় টেকা দায়। উন্মুক্ত এই বর্জ্য থেকে নির্গত বিষাক্ত তরল পাশের সাপানিয়া খাল হয়ে মিশছে কীর্তনখোলা নদীতে, যা নদীর পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শীতকালে বর্জ্যের স্তূপে আগুন দিলে বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঢেকে যায় পুরো এলাকা।

অসহনীয় এই পরিস্থিতির কথা জানাতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা আরিফ বলেন, "আমার ছোট বোনের বিয়ের বয়স হয়েছে। কিন্তু এই ময়লাখোলার দুর্গন্ধে কেউ এখানে বিয়ে করতে বা আত্মীয়তা করতে আসতে চায় না। বাধ্য হয়ে বাবা-মাকে নিয়ে শহরের চৌমাথা এলাকায় আলাদা বাসা ভাড়া করে দিয়েছি শুধু বোনের ভালো জায়গায় বিয়ের জন্য। আর আমি আমাদের নিজেদের বাড়িতে একা থাকছি।"

রহমান নামের আরেক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, "দুর্গন্ধে আমার বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারে না। বয়স্ক বাবার নানা রোগব্যাধি দেখা দিয়েছে। আমরা যে এই এলাকা ছেড়ে চলে যাব, সেই উপায়ও নেই। কারণ, এই ডাম্পিং স্টেশনের কারণে এলাকার জমির দাম একেবারে কমে গেছে। জমি বিক্রি করে যে অন্য কোথাও যাব, তা-ও সম্ভব হচ্ছে না।"

স্থানীয়দের এমন চরম দুর্ভোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা নতুন পরিকল্পনার কথা জানান। বিসিসির প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ইউসুফ আলী বলেন, "ডাম্পিং স্টেশন স্থানান্তরের জন্য কয়েকটি সম্ভাব্য জায়গা চিহ্নিত করে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই চলছে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনাও হচ্ছে।"

এ বিষয়ে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, "নগরীর ভেতরে কোনোভাবেই এই ভাগাড় রাখা হবে না। বিদ্যমান ডাম্পিং স্টেশনটি আধুনিকায়নের জন্য চীনের একটি প্রতিনিধিদল কাজ করছে। চলতি মাসেই নতুন স্থান নির্ধারণের বিষয়ে আমরা বৈঠকে বসব।"

তিনি আরও জানান, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পলিথিন ও প্লাস্টিকজাত বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেন উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।

তবে স্থানীয়দের শঙ্কা, গত দুই দশকের মতো এবারও এসব প্রতিশ্রুতি শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না। ময়লাখোলার দুর্গন্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে বসবাস করতে করতে তাদের ধৈর্যের সীমা অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে। এখন তারা শুধু আশ্বাসের বাণী নয়, চান দ্রুত ও দৃশ্যমান কার্যকর সমাধান।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।