বেগমগঞ্জে পরিবহন শ্রমিককে দিয়ে শিশুদের হামের টিকা প্রদান: চরম মৃত্যুঝুঁকিতে শতাধিক শিশু
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে শিশুদের হামের টিকা প্রদান ক্যাম্পে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য সহকারীর বদলে ফারুক আল মাহি নামের এক পরিবহন শ্রমিক (পোর্টার) শিশুদের শরীরে ইনজেকশন পুশ করেছেন। এতে ওই ক্যাম্পে টিকা নেওয়া শতাধিক শিশু মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিতে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা।
জানা গেছে, গত ২০ এপ্রিল থেকে বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী পৌরসভাসহ ১৬টি ইউনিয়নে শিশুদের হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। এরই অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার ৮ নম্বর বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের আমানতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে টিকাদানের ক্যাম্প বসে। এই কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন স্বাস্থ্য সহকারী লিলি সুলতানা। কিন্তু তিনি নিজে টিকা না দিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের অনিয়মিত পরিবহন শ্রমিক ফারুক আল মাহিকে দিয়ে শিশুদের টিকা প্রদান করান।
এ সময় উপস্থিত অভিভাবকরা বহিরাগত ও অদক্ষ একজনকে দিয়ে টিকা দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানালে স্বাস্থ্য সহকারী লিলি সুলতানা তা আমলেই নেননি। উল্টো তিনি অভিভাবকদের বলেন, এই শ্রমিকের অনেক ‘অভিজ্ঞতা’ রয়েছে, তাই কোনো সমস্যা হবে না। এভাবে ওই শ্রমিককে দিয়ে প্রায় শতাধিক শিশুকে টিকা দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত স্বাস্থ্য সহকারী লিলি সুলতানা অদ্ভুত যুক্তি দেখিয়ে বলেন, "টিকা দেওয়া লোকটি আমাদের পরিবহন শ্রমিক (পোর্টার) হলেও, দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে সে বহু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। অতীতে অন্য স্টাফরাও তাকে দিয়ে টিকা প্রদানসহ স্বাস্থ্যসেবার অনেক কাজ করিয়েছেন। আমি করালেই অনেকে দোষ খোঁজেন। সমালোচকরা সবসময় ভালো কাজের বিপরীত অবস্থান নেন।"
তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি অত্যন্ত ভয়াবহ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন এমবিবিএস চিকিৎসক জানান, যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সনদধারী স্বাস্থ্যকর্মী ছাড়া শিশুদের টিকা দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, "হামের টিকা সাধারণত শিশুদের চামড়ার নিচে (Subcutaneous) পুশ করতে হয়। অদক্ষ হাতের কারণে ইনজেকশনের সুচ চামড়া ভেদ করে মাংসপেশি বা হাড়ে আঘাত করলে শিশুর প্রচণ্ড জ্বর আসতে পারে। এমনকি ওই স্থানে গভীর ক্ষত বা পচন সৃষ্টি হয়ে তা শিশুর মৃত্যুর কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে।"
পুরো ঘটনাটি নিয়ে বেগমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাসান খায়ের চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "অনেকেই আমাকে বিষয়টি অবগত করেছেন। ঘটনাটি শুনে আমি সত্যিই মর্মাহত। একজন পরিবহন শ্রমিক কোনোভাবেই শিশুদের টিকা দিতে পারেন না। কেবলমাত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীরাই টিকা দেওয়ার অধিকার রাখেন, যাতে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি না থাকে।"
তিনি আরও জানান, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্বাস্থ্য বিভাগের মতো সংবেদনশীল জায়গায় এমন চরম অবহেলার ঘটনায় স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা অভিযুক্ত স্বাস্থ্য সহকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
What's Your Reaction?
রিপন মজুমদার, জেলা প্রতিনিধি, নোয়াখালিঃ