আসছে বর্ষা: নীলফামারীর তিস্তাপারে নৌকা তৈরি ও মেরামতের ধুম

হাসানুজ্জামান সিদ্দিকী হাসান, জলঢাকা প্রতিনিধি, নীলফামারীঃ
১ জুন, ২০২৬ ১২:১৭ পিএম
শেয়ার করুন:
আসছে বর্ষা: নীলফামারীর তিস্তাপারে নৌকা তৈরি ও মেরামতের ধুম

আসছে বর্ষা মৌসুম। প্রতি বছর এই সময়ে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলা দিয়ে বয়ে চলা তিস্তা নদীর নিম্নাঞ্চল পানিতে প্লাবিত হয়। তাই বর্ষার আগেই তিস্তার তীরবর্তী এলাকাগুলোতে শুরু হয়েছে নৌকা তৈরির ধুম। পাশাপাশি চলছে পুরোনো নৌকা মেরামতের ব্যস্ততা। 

তিস্তা তীরবর্তী নৌকার মাঝি, জেলে ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কম থাকায় নৌকার ব্যবহার অনেকটাই কমে যায়। তবে বর্ষা এলেই তিস্তা ফিরে পায় তার পূর্ণ যৌবন, কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে নদীর বুক। তখন নদীঘেঁষা মানুষের চলাচলের প্রধান ও একমাত্র বাহন হয়ে ওঠে নৌকা। এ কারণেই বর্ষা ঘনিয়ে এলেই বাড়ে নৌকার কদর, সেই সঙ্গে বাড়ে কারিগরদের ব্যস্ততা। 

সরেজমিনে উপজেলার শৌলমারী, কৈমারী, ডাউয়াবাড়ী এবং গোলমুন্ডা ইউনিয়নের তিস্তাপারের চরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দিনভর নৌকা তৈরি ও মেরামতের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। কেউ নতুন কাঠ চিরছেন, আবার কেউ পুরোনো নৌকা মেরামত করে পানিতে ভাসানোর উপযোগী করে তুলছেন। 

শৌলমারী বানপাড়া ঘাটের মাঝি আলম জানান, শুকনো মৌসুমে পানি কম থাকায় এই সময়টিই নৌকা মেরামতের উপযুক্ত সময়। তিনি ইতিমধ্যে একটি বড় নৌকাসহ মোট তিনটি নৌকা মেরামত করে বর্ষার জন্য প্রস্তুত করেছেন। খরচ সম্পর্কে তিনি বলেন, “৩ টন ধারণক্ষমতার একটি পুরোনো নৌকা মেরামত করতে বর্তমানে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। আর একই মাপের নতুন নৌকা বানাতে লাগে প্রায় ৭০ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ১০ টন ধারণক্ষমতার বড় নৌকা তৈরি করতে লক্ষাধিক টাকা গুণতে হয়।” 

তিনি আরও জানান, বর্ষার আগে নৌকার কারিগরদের চাহিদাও অনেক বেড়ে যায়। নৌকার মাপ অনুযায়ী 'হাত' হিসেবে মজুরি নির্ধারিত হয়, যেখানে প্রতি হাত মেরামতের জন্য ১০০ টাকা দিতে হয়। একটি বড় নৌকা মেরামতে কেবল কারিগরের মজুরিই আসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ভালো কারিগর পেতে অনেক সময় আগামী মৌসুমের জন্য অগ্রিম টাকাও দিয়ে রাখতে হয়।

নৌকা তৈরির কারিগর রশিদুল ইসলাম বলেন, “নৌকা তৈরি ও মেরামত আমার বাপ-দাদার পেশা। গত ২০ বছর ধরে এই পেশা আঁকড়ে আছি। প্রতি মৌসুমে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২০টি নতুন নৌকা বানাই, পাশাপাশি পুরোনো নৌকাও মেরামত করি।” 

তিনি জানান, একটি ছোট নৌকা তৈরি করতে দুই থেকে চার দিন এবং বড় নৌকা তৈরি করতে ২৫ থেকে ৩০ দিন সময় লাগে। নৌকা তৈরিতে সাধারণত আকাশমণি, মেহগনি, কড়ই ও ছামালিশ গাছের কাঠ বেশি ব্যবহৃত হয়। পারিশ্রমিক হিসেবে ছোট নতুন নৌকা তৈরিতে ১০ থেকে ১২ হাজার এবং বড় নৌকায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পান তিনি। এছাড়া মেরামত কাজে আকারভেদে ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি মেলে। 

এ বিষয়ে জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাদেকুল সিদ্দিক সাদেক এবং শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান বলেন, “বর্ষা মৌসুমে চরাঞ্চলের পানিবন্দি মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা এই নৌকা। তাই বর্ষার আগেই সবাই নৌকা প্রস্তুত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। চরের মানুষ শুকনো মৌসুমে তিস্তায় মাছ ধরে এবং কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করলেও, বর্ষায় নৌকাই হয়ে ওঠে তাদের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।”

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।