বাম্পার ফলনেও হাসি নেই লালমনিরহাটের কৃষকদের মুখে, ন্যায্যমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তা
লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলার দিগন্তজোড়া মাঠে এখন পাকা ধানের সোনালি আভা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষকের আঙিনায় চলছে ধান কাটা, মাড়াই আর ঘরে তোলার ব্যস্ততা। চলতি মৌসুমে জেলাজুড়ে ইরি-বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষি বিভাগের নিবিড় তদারকিতে ফলন আশাতীত হলেও কৃষকদের মনে নেই আনন্দের রেশ।
মাঠে ফসলের প্রাচুর্য থাকলেও বাজারে ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম না থাকায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। শ্রমিক সংকট, উচ্চ মজুরি, সেচ ও জ্বালানি খরচের প্রভাবে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় এখন লোকসানের আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।
সরেজমিনে লালমনিরহাট সদর, কালীগঞ্জ, আদিতমারী, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, দিন-রাত পরিবার-পরিজন নিয়ে মাঠে কাজ করছেন চাষিরা। তবে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিয়ে তাদের কণ্ঠে ঝরছে হাহাকার।
কালীগঞ্জ উপজেলার চাপারহাট বাজারে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক মফিজুল ইসলাম বলেন, "কষ্ট করে ধান ঘরে তুললাম, কিন্তু বাজারে এনে দেখি দাম নেই। যে দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে, তাতে উৎপাদন খরচই উঠছে না।"
একই উপজেলার সতীরপাড় গ্রামের কৃষক বাদশালী আক্ষেপ করে বলেন, "এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে প্রায় ১১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলন ভালো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বর্তমান বাজারদরে লাভ তো দূরের কথা, বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে।"
প্রাকৃতিক দুর্যোগও অনেক কৃষকের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। হাতীবান্ধা উপজেলার ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের ভোলারডাঙ্গা এলাকার কৃষক আব্দুস ছালাম জানান, টানা বৃষ্টি ও কালবৈশাখীর কারণে অনেক জমির ধান পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। সেই ধান কাটাতে অতিরিক্ত মজুরি দিয়ে শ্রমিক নিতে হয়েছে। ফলে তার উৎপাদন খরচ সাধারণের চেয়ে আরও অনেক বেড়ে গেছে।
অভিযোগ উঠেছে, সরকারিভাবে প্রতি কেজি ধানের সংগ্রহ মূল্য ৩৬ টাকা (মণ প্রতি ১,৪৪০ টাকা) নির্ধারণ করা হলেও স্থানীয় বাজারে এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না সাধারণ কৃষকরা। বর্তমানে বিভিন্ন হাটে প্রতি মণ কাঁচা ধান মাত্র ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ পড়ছে প্রায় এক হাজার টাকা। প্রতি মণে অন্তত ১৫০ থেকে ২০০ টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে তাদের।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তুষার কান্তি রায় বলেন, "আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সচেতনতার কারণে জেলায় এবার বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। বাজারে নতুন ধান আসায় চালের দাম স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করছি।"
তবে সাধারণ কৃষকদের দাবি, সরকারি ধান সংগ্রহ অভিযান আরও জোরদার করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার ব্যবস্থা করা হলে তারা কিছুটা স্বস্তি পেতেন। অন্যথায় আগামীতে ধান চাষে আগ্রহ হারাবেন উত্তরের এই জনপদের কৃষকরা।
What's Your Reaction?
মো: হাসমত উল্লাহ, লালমনিরহাট