বেতন তোলেন রাজবাড়ীতে থাকেন রাজধানীতে

মোঃ আজমল হোসেন, বালিয়াকান্দি প্রতিনিধি, রাজবাড়ীঃ
Apr 10, 2026 - 19:40
Apr 10, 2026 - 19:40
বেতন তোলেন রাজবাড়ীতে থাকেন রাজধানীতে

থাকার কথা দুজন চিকিৎসক, কিন্তু আছেন মাত্র একজন। তিনিও অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকেন দাপ্তরিক কাজে। ফলে চিকিৎসকশূন্য অবস্থায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র। শুধু নারুয়া নয়, রাজবাড়ী জেলার প্রান্তিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার চিত্র এখন এমনই করুণ। ‘সংযুক্তি’ বা ‘অ্যাটাচমেন্ট’-এর মারপ্যাঁচে চিকিৎসকরা রাজধানীতে আয়েশি জীবন কাটালেও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জেলার লাখ লাখ মানুষ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজবাড়ীর ৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসারের পদ রয়েছে ১৬৫টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ১০৫ জন। তবে এই ১০৫ জনের মধ্যে ২২ জন চিকিৎসকই ‘সংযুক্তি’ নিয়ে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। তারা রাজবাড়ীর কর্মস্থলে না থাকলেও নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলছেন এখান থেকেই। নিয়মানুযায়ী চিকিৎসক সংকট মেটাতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সংযুক্তি দেওয়ার কথা থাকলেও, রাজবাড়ীর ক্ষেত্রে ঘটছে উল্টোটা। এখানে চিকিৎসকের তীব্র সংকট থাকা সত্ত্বেও এখান থেকেই চিকিৎসকদের ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) বা স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মতো সংগঠনের নেতা ও প্রভাবশালী চিকিৎসকরা এই ‘সংযুক্তির সোনার হরিণ’ বাগিয়ে নেন। একবার যারা ঢাকা যান, তারা আর কোনোদিন তৃণমূলের কর্মস্থলে ফিরে আসেন না। ফলে মাঠ পর্যায়ে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ চিকিৎসক সংকট।

জেলার ২৪টি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মধ্যে ১৯টিতেই কোনো মেডিকেল অফিসার নেই। তারা সবাই সংযুক্তিতে ঢাকায় অবস্থান করছেন। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষ। বাধ্য হয়ে তারা ভিড় করছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে। সেখানেও চিকিৎসক স্বল্পতায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে রোগীদের। চিকিৎসক কম হওয়ায় পর্যাপ্ত সময় নিয়ে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন না তারা।

সরেজমিনে পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা আফরোজা বেগম বলেন, “দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে ডাক্তারের দেখা পেলাম, কিন্তু ভিড়ের চাপে কথা বলার সুযোগ পেলাম না। ডাক্তাররা এত রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।” একই অভিজ্ঞতা কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা খালেক মিয়ার। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার নেই, তাই এখানে আসা। এখানে এসে দেখি তিল ধারণের জায়গা নেই। ডাক্তাররা যেনতেনভাবে প্রেসক্রিপশন লিখে বিদায় করছেন।”

পরিসংখ্যান বলছে, জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব প্রকট। পাংশায় ১১টি জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদের ৭টিই শূন্য। বালিয়াকান্দিতে ১০টির মধ্যে ৭টি, গোয়ালন্দে ১০টির মধ্যে ৬টি এবং কালুখালীতে ৪টির মধ্যে ২টি বিশেষজ্ঞ পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়াও মেডিকেল অফিসারদের পদের একটি বড় অংশই খালি পড়ে আছে।

রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “সংযুক্তিতে থাকা চিকিৎসকদের বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবগত। চিকিৎসক সংকটের প্রভাব সদর হাসপাতালসহ সব পর্যায়েই পড়ছে।”

পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. গিয়াস উদ্দিন খান জানান, উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকে চিকিৎসকরা সংযুক্তিতে চলে যাওয়ার পর চিকিৎসা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানিয়েও কোনো প্রতিকার মেলেনি।

ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দাবি, প্রান্তিক জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে অবিলম্বে সংযুক্ত থাকা চিকিৎসকদের মূল কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা হোক। অন্যথায় রাজবাড়ীর স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow