চোখের সামনে ‘শেষ’ ঢাকার খাল অনেক স্থানে চিহ্নও নেই
একসময়ের প্রবহমান খালগুলো আজ ঢাকার মানচিত্র থেকে প্রায় মুছে যেতে বসেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দীর্ঘদিনের দখল এবং দূষণের কবলে পড়ে রাজধানীর সিংহভাগ খাল এখন কেবল ইতিহাসের পাতায় জায়গা পাওয়ার অপেক্ষায়। গবেষণার তথ্য বলছে, অতীতে ঢাকায় প্রায় ৩৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল থাকলেও বর্তমানে তার প্রায় ৬৪ শতাংশই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
দখলের থাবায় রামচন্দ্রপুর খাল
মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খালটির বর্তমান অবস্থা ঢাকার খালগুলোর করুণ দশা তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, একসময় এই খালে ১২ মাসই নৌকা ও ট্রলার চলত। কিন্তু সিএস খতিয়ান অনুযায়ী, খালটির দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৬৫ কিলোমিটারের প্রায় অর্ধেকই আজ দখলদারদের কবলে। বছিলা থেকে শুরু করে তুরাগ নদ পর্যন্ত বিস্তৃত এই খালের পাড়ে গড়ে উঠেছে বাসাবাড়ি, খেলার মাঠ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ অসংখ্য স্থায়ী স্থাপনা। দখলের এই তালিকায় সরকারি-বেসরকারি রাস্তার পাশাপাশি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বাড়িঘরের আধিক্যই বেশি।
সিটি করপোরেশনের হাতে স্থানান্তর ও ব্যর্থতার বৃত্ত
২০২০ সালে ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে রাজধানীর ২৬টি খালের দায়িত্ব বুঝে নেয় দুই সিটি করপোরেশন। সে সময় খালগুলো পুনরুদ্ধার, সীমানা নির্ধারণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন দায়িত্বশীলরা। পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও কোনো একটি খালও পুরোপুরি দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। উল্টো খাল পরিষ্কার ও খননের নামে হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও পরিস্থিতির কোনো টেকসই উন্নতি হয়নি।
বক্স কালভার্টে রূপান্তরের ট্র্যাজেডি
শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে বিভিন্ন সময় অনেক খালকে বক্স কালভার্টে রূপান্তর করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এতে খালগুলো পুনরুদ্ধার হওয়ার বদলে স্থায়ীভাবে হারিয়ে গেছে। পান্থপথ, সেগুনবাগিচা, ধোলাইখাল ও পরীবাগ খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলো আজ মূলত রাস্তায় পরিণত হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন ৫০ হাজার কোটি টাকা
রাজউক প্রণীত ‘ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান’ (ড্যাপ) অনুযায়ী, ঢাকার অবশিষ্ট ৬৫টি খালকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটের প্রয়োজন। রাজউক চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, খালগুলো পুনরুদ্ধারে এখন সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও পরামর্শ
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, খালগুলো শুধু উদ্ধার করলেই হবে না, বরং সেগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “খাল দখলকারীদের তালিকা প্রকাশ করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি, খালের পাড়ে অবৈধ স্থাপনা না করে সবুজায়ন এবং স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে কমিটি গঠনের মাধ্যমে খাল রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।”
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত না হলে এবং খালের ভেতর ময়লা ফেলা বন্ধ না হলে প্রতিটি খালই পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। তাই কেবল দায়সারা পরিষ্কার অভিযান নয়, খালগুলোকে নগরীর ‘ফুসফুস’ হিসেবে বাঁচিয়ে রাখতে প্রশাসনিক ও সামাজিক—উভয় পর্যায়ের কঠোরতা এখন সময়ের দাবি।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ