‘রিফাইন্ড’ আওয়ামী লীগে সায় নেই, অপেক্ষাতেই দল
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়া আওয়ামী লীগ বর্তমানে এক লক্ষ্যহীন রাজনৈতিক চোরাবালিতে আটকে আছে। দলের ভেতরে ‘রিফাইন্ড’ বা সংস্কারপন্থী আওয়ামী লীগের ধারণা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও, তাতে বিন্দুমাত্র সায় নেই শীর্ষ নেতৃত্বের। বিশেষ করে দেশত্যাগী দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্বে বড় কোনো পরিবর্তনের বিপক্ষে অনড় অবস্থানে রয়েছেন। ফলে দলটির রাজনীতিতে ফেরার পথ যেমন অস্পষ্ট, তেমনি নেতা-কর্মীদের মধ্যে বাড়ছে চরম হতাশা।
প্রথম আলোর বিশেষ ধারাবাহিক ‘রাজনীতির হালচাল’-এর শেষ পর্বে আওয়ামী লীগের বর্তমান এই করুণ দশা ফুটে উঠেছে।
সংস্কারের পথ রুদ্ধ
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বিগত নির্বাচনের আগে ও পরে বিতর্কিত নেতাদের সরিয়ে অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাদের নেতৃত্বে আনার একটি প্রস্তাব বন্ধুপ্রতিম দেশ ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার কাছে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি নিজের পদ ছাড়তে নারাজ। বড়জোর মুখপাত্র হিসেবে তাঁর পছন্দের কাউকে দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলেন, যা কোনো পক্ষকেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ফলে ‘পরিশুদ্ধ’ আওয়ামী লীগ গঠনের সম্ভাবনা এখন প্রায় মৃত।
অপেক্ষায় টিকে থাকা
বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত ‘অপেক্ষার রাজনীতি’। দলটির একটি অংশ মনে করছে, বর্তমান বিএনপি সরকার যদি কোনো বড় ভুল করে বা জনগণের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তবেই কেবল তাদের ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই অপেক্ষা কতদিনের, তা কারও জানা নেই। মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় বর্তমানে ঝটিকা মিছিল আর অনলাইন প্রচারণাই দলটির একমাত্র কর্মকাণ্ড।
বিচ্ছিন্ন ও হতাশ নেতৃত্ব
আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। কেউ ভারত, কেউ মালয়েশিয়া, আবার কেউ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে। ওয়াকিবহাল সূত্রমতে, শেখ হাসিনা নিজেই ভারতের দিল্লি থেকে দলের নীতি নির্ধারণ করছেন। তাঁর সাথে সমন্বয় করছেন জাহাঙ্গীর কবির নানক ও বাহাউদ্দিন নাছিমের মতো কট্টরপন্থীরা। তবে দীর্ঘ প্রবাস জীবন এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে অনেক নেতার মধ্যেই দেখা দিয়েছে মানসিক ও আর্থিক ক্লান্তি। এমনকি ভারত থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অনেকে অন্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
আইনি ও রাজনৈতিক বাধা
দেশে থাকা অনেক নেতার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা রয়েছে। ব্যবসায়িক স্বার্থে বা বয়সের কারণে অনেকে রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হতে চাইলেও জামিন বা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকায় তাঁরা দেশে ফিরতে পারছেন না। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকার ও পরবর্তী বিএনপি সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে আওয়ামী লীগের রাজনীতির মাঠ পুনরুদ্ধারের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মত
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের মতে, আওয়ামী লীগকে যদি রাজনীতিতে ফিরতে হয়, তবে আগে তাদের গত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের ভুল স্বীকার করে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ফৌজদারি অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া মেনে নেওয়া ছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই। গায়ের জোরে বা বিদেশি শক্তির সহায়তায় ফেরার চেষ্টা করলে দেশ আরও বড় সংঘাতের দিকে যেতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
সব মিলিয়ে, সাড়ে ১৫ বছর প্রতাপের সঙ্গে দেশ শাসন করা দলটি এখন নিজস্ব নেতৃত্ব রক্ষা আর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার দ্বন্দ্বে দিশেহারা। সংস্কারের সুযোগ পায়ে ঠেলে তারা এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অপেক্ষায় দিন গুনছে।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ