আতঙ্কের নাম ‘হাম’: ঈদযাত্রায় সংক্রমণের ঝুঁকি, ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৬ শিশুর মৃত্যু
দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা জনমনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের ভিড় এই সংক্রমণকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। এ পর্যন্ত দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৫২২ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে।
সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি ও ঈদযাত্রার ঝুঁকি
ঈদের ছুটিতে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে কোটি মানুষ গ্রাম অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভিড় এবং সামাজিক মেলামেশার কারণে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। চিকিৎসকরা বলছেন, দেশে বড় পরিসরে টিকাদান কর্মসূচি চললেও এখনো ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সামষ্টিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। এমনকি যারা টিকা নিয়েছে, তাদের একটি বড় অংশের মধ্যেও কার্যকর প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হওয়ায় তারা নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে।
পুষ্টিহীনতা ও টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
এক চিকিৎসা গবেষকের মতে, টিকা নেওয়া শিশুদের একটি অংশের মধ্যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা প্রত্যাশিত মাত্রায় পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া গত দুই বছরে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন না হওয়া এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের প্রয়োজনীয় আয়রন ও ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতির ফলে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টিজনিত দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। এই অপুষ্টিই হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিনের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান ডা. আরিফা আকরাম সতর্ক করে বলেন, "হার্ড ইমিউনিটি তৈরি না হওয়ায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ঈদের ছুটিতে মানুষের যাতায়াতের ফলে সংক্রমণ গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।"
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সতর্কতা
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন শিশুদের সুরক্ষায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, "ঈদের সময় শিশুদের নিয়ে যত্রতত্র ভ্রমণ বা ভিড়ের মধ্যে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। বিশেষ করে আক্রান্ত শিশুদের থেকে সুস্থ শিশুদের দূরে রাখতে হবে। পরিবারের সচেতনতাই পারে এই দুর্যোগ মোকাবিলা করতে।"
টিকাদান কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা
হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে গত এপ্রিল মাস থেকে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে এই টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা দেওয়ার পর শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে অন্তত এক মাস সময় লাগে। ফলে যারা সম্প্রতি টিকা নিয়েছে, তাদের সুরক্ষার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
পরিসংখ্যানের চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ১২৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং ১ হাজার ৩০৬ জন শিশু লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ৬২২ জন এবং সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৬৩ হাজার ৮১৩ জন। এখন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১৭৪ জন এবং রাজশাহী বিভাগে ৮০ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ পরামর্শ দিয়েছেন, যাদের ছোট শিশু রয়েছে, তাদের এই পরিস্থিতিতে ঈদযাত্রা পরিহার করাই শ্রেয়। কারণ ঢাকার বাইরে আক্রান্ত শিশুদের উন্নত চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ