মাগুরায় দিগন্তজোড়া সূর্যমুখী কৃষিতে হলুদ বিপ্লব, বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি

বিশ্বজিৎ সিংহ রায়, স্টাফ রিপোর্টার, মাগুরাঃ
Mar 4, 2026 - 16:13
Mar 4, 2026 - 16:13
মাগুরায় দিগন্তজোড়া সূর্যমুখী কৃষিতে হলুদ বিপ্লব, বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি

মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের কাওড়া গ্রামের চৌগাছা এলাকায় এখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে যেদিকে চোখ যায়, কেবলই সোনালি সূর্যমুখীর সমারোহ। একসময়ের কম ফলনশীল জমি আজ রূপ নিয়েছে সম্ভাবনার উর্বর ভান্ডারে। কৃষকের মুখে হাসি আর মাঠে কর্মচাঞ্চল্য—সব মিলিয়ে ওই এলাকায় বইছে কৃষি জাগরণের এক নতুন হাওয়া।

জানা যায়, কাওড়া গ্রামের কয়েকজন উদ্যমী কৃষক একত্রিত হয়ে দুই একরেরও বেশি জমিতে বাণিজ্যিকভাবে সূর্যমুখীর চাষ করেছেন। এই কৃষকদের মধ্যে রয়েছেন সঞ্জয় বিশ্বাস, নাজমুল শেখ, আরব শেখ, আতিকুল শেখ, সোলাইমান শেখ ও গোপাল বিশ্বাস। চলতি রবি-২৫ মৌসুমে তারা ‘সূর্যমুখী আরডিএস-২৭২’ জাতের বীজ বপন করেছেন। তাদের কঠোর পরিশ্রমে মাঠে এখন হলুদের আভা।

মহম্মদপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘পার্টনার’ প্রকল্পের আওতায় এবং সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই চাষাবাদ পরিচালিত হচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করে চাষিদের উন্নত জাতের বীজ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা ও সময়োপযোগী পরিচর্যার পরামর্শ দিচ্ছেন। 

সূর্যমুখী চাষি আরব শেখ নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, "গত বছর যারা সূর্যমুখী চাষ করেছিলেন, তাদের ভালো ফলন ও লাভ দেখে এবার আমি এই চাষে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। ফলন ভালো হলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে সূর্যমুখীর চাষ করার ইচ্ছা আছে।"

কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ধান বা অন্যান্য ফসলের তুলনায় সূর্যমুখী চাষে সেচের প্রয়োজন অনেক কম। জমিতে সাময়িক পানি জমে থাকলেও ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন মাসের মধ্যেই ফসল ঘরে তোলা যায়। প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় লাভের সম্ভাবনাও বেশি। বর্তমানে বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধি এবং মানুষের স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ার কারণে সূর্যমুখী তেলের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। ফসল বহুমুখীকরণের ফলে যেমন কৃষকের ঝুঁকি কমছে ও আয় বাড়ছে, তেমনি রোপণ, আগাছা পরিষ্কার ও ফসল সংগ্রহে স্থানীয় শ্রমিকদের নতুন কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি এই সূর্যমুখীর মাঠ এখন স্থানীয় দর্শনার্থীদেরও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বিকেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই হলুদ ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে, ছবি তুলতে ও ভিডিও করতে মাঠে ভিড় জমাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ছবি ছড়িয়ে পড়ায় এলাকার পরিচিতিও বাড়ছে।

এ বিষয়ে মহম্মদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পীযুষ রায় বলেন, "কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধানে ‘পার্টনার’ প্রকল্পের আওতায় বালিদিয়া ইউনিয়নের কাওড়া গ্রামে এই সূর্যমুখী চাষ হচ্ছে। ইতোমধ্যেই জমির প্রায় ৫০ শতাংশ ফুল ফুটেছে, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে পুরো মাঠ ফুলে ভরে যাবে। সূর্যমুখীর তেল কোলেস্টেরলমুক্ত এবং স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।"

দিগন্তজোড়া এই হলুদ ফুল যেন গ্রামবাংলার মাটি থেকে এক নতুন বার্তা দিচ্ছে। সঠিক দিকনির্দেশনা, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকের অদম্য পরিশ্রমে যে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব, এটি তারই প্রমাণ। মহম্মদপুরের এই সূর্যমুখী ক্ষেত তাই কেবলই একটি ফসলের গল্প নয়; বরং এটি অপার সম্ভাবনা, আত্মবিশ্বাস ও স্বনির্ভরতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow