আগুনের লেলিহান শিখায়ও সন্তানকে ছাড়েননি বাবা-মা

অনলাইন ডেস্কঃ
১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ৪:৫২ পিএম
শেয়ার করুন:
আগুনের লেলিহান শিখায়ও সন্তানকে ছাড়েননি বাবা-মা

চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা আর দমবন্ধ করা বিষাক্ত কালো ধোঁয়া। বাঁচার শেষ আশায় কেউ ছুটেছিলেন দরজার দিকে, আবার কেউ একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার আশায় আশ্রয় নিয়েছিলেন বাথরুমে। তবে একটি কক্ষের দৃশ্য উদ্ধারকর্মীদেরও স্তব্ধ করে দিয়েছে। সেখানে দেখা গেছে—এক মা তার কোলের শিশুকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন, আর বাবা নিজের শরীর দিয়ে মা ও সন্তান দুজনকেই আড়াল করে রক্ষার শেষ চেষ্টা করছেন। 

আগুনের নির্মম থাবা থেকে সন্তানকে বাঁচানোর সেই আকুল চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি, তবে উদ্ধারকর্মীদের চোখে ধরা পড়া দৃশ্যটি আজীবন মনে রাখার মতো। আগুনে ঝলসে যাওয়া তিনটি নিথর দেহের মধ্যে যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বাবা-মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর সন্তানকে বাঁচানোর শেষ আকুতি। 

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় অবস্থিত ‘টুপটুপ রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর এমন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য সামনে আসে। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে এক নারী, এক পুরুষ ও এক শিশুর দেহ ছিল। আগুনে শরীর এতটাই পুড়ে গেছে যে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া কারও পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। 

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য বলেন, “উদ্ধার অভিযানে গিয়ে মনে হয়েছে—নারীটি শিশুটিকে পরম মমতায় বুকে আঁকড়ে ধরেছিলেন, আর পুরুষটি নিজের শরীর দিয়ে তাদের দুজনকে আগুনের হাত থেকে আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনটি দেহই ভীষণভাবে পুড়ে গেছে। তাদের পাশেই পাওয়া গেছে আরেক নারীর মরদেহ।”

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর শুরু হয় তল্লাশি। রিসোর্টের দোতলার একটি কক্ষ থেকে প্রথমে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে পাশের একটি কক্ষের বাথরুম থেকে এক পুরুষের এবং তিনতলার বাথরুম থেকে আরও চারটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিরাপদ ভেবে যারা বাথরুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন, বিষাক্ত ধোঁয়া ও তাপে সেখান থেকেও তারা বের হতে পারেননি।

ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণশৈলী:  
দোলন আচার্য জানান, রিসোর্টটির নির্মাণে অগ্নিনিরাপত্তার চরম ঘাটতি ছিল। ভবনটির কলাম কংক্রিটের হলেও বিম, দেয়াল ও সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছিল কাঠ ও বাঁশ দিয়ে। কেবল বাথরুমগুলো ছিল টাইলস করা কংক্রিটের। ফলে আগুন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং আটকে পড়া মানুষদের পালানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়।

নিখোঁজ একটি পরিবারের চার সদস্য:  
অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই রিসোর্টটিতে অবস্থান করা একটি পরিবারের চার সদস্যের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তারা হলেন—নাহিদুর রহমান তুহিন (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬) এবং তাদের দুই শিশুকন্যা রুজাইনা ইনায়া (৭) ও সুনাইনা ইহানা (৩)। 

তুহিনের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স জানান, উদ্ধার হওয়া সেই তিনটি মরদেহ তার ভাই, ভাবি ও এক ভাতিজির হতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন। তবে ডিএনএ পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত প্রিয়জন হারানোর এই নির্মম সত্যটি নিশ্চিত হতে পারছেন না তারা। 

স্বজনদের অপেক্ষার প্রহর আর বৈজ্ঞানিক শনাক্তকরণের অনিশ্চয়তার মাঝে টুপটুপ রিসোর্টের সেই নিথর দেহগুলো যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়—মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সন্তানের প্রতি মা-বাবার ভালোবাসা কতটা অসীম।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।