ইতালির প্রলোভনে লিবিয়ায় জিম্মি ও নির্যাতন: সালথায় মানবপাচারকারীদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন

জাকির হোসেন, স্টাফ রিপোর্টারঃ
১৭ জুলাই, ২০২৬ ৭:২৭ পিএম
শেয়ার করুন:
ইতালির প্রলোভনে লিবিয়ায় জিম্মি ও নির্যাতন: সালথায় মানবপাচারকারীদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন

ফরিদপুরের সালথায় ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে কোটি টাকা আত্মসাৎ, লিবিয়ায় জিম্মি করে নির্যাতন ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রের সদস্যদের দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরতের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় এলাকাবাসী।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেলে উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের বাহিরদিয়া বাজার এলাকায় এ মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। 

মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, উপজেলার বাহিরদিয়া গ্রামের বাদশা মোল্লার ছেলে এনামুল মোল্লা (২৫) ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে স্থানীয় প্রায় ২০ থেকে ২৫ জনের কাছ থেকে প্রায় এক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী কাউকেই ইতালিতে পাঠাতে পারেননি। উল্টো চক্রটি ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধাপে অর্থ আদায় করে প্রথমে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে তাদের একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের কাছে জিম্মি করে রাখা হয়। এরপর অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে ও অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে মুক্তিপণের নামে স্বজনদের কাছ থেকে আরও অর্থ আদায় করা হয়। ভুক্তভোগীদের স্বজনদের দাবি, নিখোঁজ হওয়া কয়েকজনের এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

মানববন্ধনে আরও অভিযোগ করা হয়, স্থানীয় ইউপি সদস্য মনজুরুল মোল্লা এই চক্রের অন্যতম প্রধান সহযোগী বা দালাল হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে এলাকার সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহে ভূমিকা রাখেন। এছাড়া চক্রটি প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে নানা ধরনের ভয়ভীতি ও হয়রানি করা হচ্ছে বলেও বক্তারা জানান।

ভুক্তভোগী হুসাইন সর্দার তাঁর নির্মম অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে বলেন, "এনামুল আমাকে ইতালিতে নেওয়ার কথা বলে লিবিয়ায় একটি অন্ধকার ঘরে আটকে রাখে। পরে আরও টাকার দাবিতে আমার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। আমার কান্নাকাটি শুনে পরিবার জমিজমা ও ধারদেনা করে অতিরিক্ত টাকা পাঠালে আমি দেশে ফিরতে সক্ষম হই। আমি এই চক্রের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।"

আরেক ভুক্তভোগী ওসমান মোল্লা বলেন, "আমাকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে ১৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে লিবিয়ায় আটকে রেখে আরও ২৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে হত্যা করে সাগরে ফেলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কোনোমতে জীবন বাঁচিয়ে দেশে ফিরতে পেরেছি।"

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার, ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরত এবং মানবপাচারকারী চক্রের সাথে জড়িত সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য মঞ্জুরুল মোল্যা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "আমাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। গ্রাম্য দলাদলির জের ধরে একটি পক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আমাদের কেবল লিবিয়ায় পাঠানোর বিষয়ে কথা হয়েছিল এবং বর্তমানে তারা সেখানেই কর্মরত আছেন। তবে আমার ছোট ভাই এনামুলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত বিষয়। তার সাথে কার কী লেনদেন হয়েছে, তা আমার জানা নেই।"

অভিযুক্ত মূল ব্যক্তি এনামুল মোল্যা বর্তমানে লিবিয়ায় অবস্থান করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আল ফাহাদ বলেন, "মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো আমরা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছি। ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর পাশাপাশি, এই অঞ্চলের যুবসমাজকে সচেতন করতে পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচারণা চালানো হবে যাতে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে কেউ এভাবে বিদেশে পা না বাড়ায়।"

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।