চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের প্রধান দুই ঘাঁটি কোতোয়ালি-পাঁচলাইশ

অনলাইন ডেস্কঃ
৭ জুন, ২০২৬ ১২:৩৭ পিএম
শেয়ার করুন:
চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের প্রধান দুই ঘাঁটি কোতোয়ালি-পাঁচলাইশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমসহ আওয়ামী শাসনামলে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় সংগঠনটি বারবার ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। মিছিলের সংখ্যা, নেতাকর্মীদের উপস্থিতি এবং সাংগঠনিক তৎপরতার দিক থেকে নগরের কোতোয়ালি ও পাঁচলাইশ থানা এলাকাকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের প্রধান দুটি ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মিছিলের পরিসংখ্যান ও পুলিশের হিসাব
নগর পুলিশ ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে ছাত্রলীগ চট্টগ্রামে বেশ কিছু ঝটিকা মিছিল করেছে। মহানগর পুলিশের রেকর্ড বলছে, এই পর্যন্ত অন্তত ১৭টি মিছিলের ঘটনা ঘটেছে। তবে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজের তথ্য ও নেতাকর্মীদের দাবি অনুযায়ী, এই সংখ্যা অন্তত ২৮টি।

থানাভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
পাঁচলাইশ থানা এলাকা: সর্বোচ্চ ৬টি মিছিল।
কোতোয়ালি থানা এলাকা: ৫টি মিছিল।
ডবলমুরিং এলাকা: ২টি মিছিল।
খুলশী, চকবাজার ও বন্দর এলাকা: ১টি করে মিছিল।

সর্বশেষ গত ১ জুন পাঁচলাইশ থানার জিইসি মোড় এলাকায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী নিয়ে একটি ঝটিকা মিছিল করে ছাত্রলীগ।

কোতোয়ালি ও পাঁচলাইশ কেন মূল কেন্দ্র?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুটি থানা এলাকায় ছাত্রলীগের ঘন ঘন তৎপরতার পেছনে মূলত তিনটি বড় কারণ রয়েছে:
১. ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক ও নেটওয়ার্ক: এই দুটি এলাকায় আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভিত্তি ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক বেশ শক্তিশালী।
২. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছাত্রাবাস: এলাকা দুটিতে একাধিক বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছাত্রাবাস থাকায় বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী সহজে জড়ো হতে ও আশ্রয় নিতে পারে।
৩. ভৌগোলিক সুবিধা: ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং সরু অলিগলি থাকায় ঝটিকা মিছিল শেষ করে দ্রুত সটকে পড়া সহজ হয়।

ঝটিকা মিছিলের কৌশল ও গ্রেপ্তার অভিযান
পুলিশ জানায়, ছাত্রলীগের মিছিলগুলো অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ হয়। কোনো কোনো মিছিল মাত্র ১৫ সেকেন্ড থেকে ৩ মিনিটের মতো স্থায়ী হয়। ফলে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই মিছিলকারীরা পালিয়ে যায়। 

সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযানে ৭০ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু খুলশী থানা এলাকা থেকে ১৩ জন এবং পাঁচলাইশ থেকে ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে গত ২৫ এপ্রিল কোতোয়ালি এলাকায় মিছিলের পর ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।

পুলিশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিছিলগুলোতে অংশ নিতে অনেক নেতাকর্মী দূর-দূরান্ত থেকে আসেন। নগর পুলিশের (উত্তর) উপ-কমিশনার আমিরুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ৬ জন খাগড়াছড়ির রামগড় থেকে এসেছিলেন। এছাড়া ভাটিয়ারি ও পটিয়া থেকেও নেতাকর্মীদের এসে মিছিলে যোগ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, নগর পুলিশের (দক্ষিণ) উপ-কমিশনার হোসাইন মো. কবির ভূঁইয়া স্পষ্ট জানিয়েছেন, নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের মিছিল-সমাবেশ করার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।

কোতোয়ালি ও পাঁচলাইশ এলাকার পূর্ব তৎপরতা

কোতোয়ালি থানার চিত্র:
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর মধ্যরাতে জামালখান ও চেরাগী পাহাড় এলাকায় প্রথম মুখে মাস্ক পরে প্রকাশ্য মিছিল করে ছাত্রলীগ। এরপর ১০ ডিসেম্বর সিআরবি এবং ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর তিনপুলের মাথায় মিছিল করে তারা। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল রেলওয়ে বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে মিছিলের পর ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মূলত জামালখান, চেরাগী পাহাড়, সিআরবি ও তিনপুলের মতো স্থানগুলো ঐতিহাসিকভাবেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং এখানে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের প্রভাব রয়েছে।

পাঁচলাইশ থানার চিত্র:
পাঁচলাইশে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি (৬টি) মিছিল হয়েছে। ২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর চটেশ্বরী সড়কে মিছিল চলাকালে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, যা গোপন করার দায়ে চকবাজার থানার চার পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পাঁচলাইশ ও বন্দর এলাকায় এবং চলতি বছরের এপ্রিলে এমইএস কলেজ ছাত্রলীগের ব্যানারে মেডিকেল সেন্টার থেকে গোলপাহাড় পর্যন্ত মিছিল করা হয়। এমইএস কলেজ ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই এলাকায় থাকায় এখানে ছাত্র সংগঠনের প্রভাব বেশি।

অন্যান্য থানার চিত্র
কোতোয়ালি ও পাঁচলাইশের বাইরেও বিভিন্ন থানায় ছাত্রলীগের মিছিলের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খুলশী এলাকায় নগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ের সামনের সড়কে মিছিল করার মতো ঘটনাও ঘটে। এছাড়া বন্দর থানা এলাকায় মিছিল থেকে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ১৮ জনকে এবং বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় মিছিল করার দায়ে ৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মাঠের রাজনীতি ও প্রতিপক্ষের নীরবতা
গত দেড় বছরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের একের পর এক ঝটিকা মিছিলের বিপরীতে মাঠের প্রধান দল বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামীকে রাজপথে কোনো দৃশ্যমান প্রতিরোধ গড়তে দেখা যায়নি। ৫ আগস্টের পর নগরের নিয়ন্ত্রণ কার্যত তাদের হাতে থাকলেও ছাত্রলীগের এই তৎপরতায় এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তি উদ্যোগে বা যুবসমাজের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ মিছিল করা হয়েছে। যেমন—গত ২ জুন নগর ছাত্রদলের সাবেক এক নেতার উদ্যোগে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা মিছিল বের করা হয়।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

এই সাইট কুকিজ ব্যবহার করে. সাইটটি ব্রাউজ করার মাধ্যমে আপনি আমাদের কুকিজ ব্যবহারে সম্মত হচ্ছেন।