সরকার প্রতিশ্রুতি রাখেনি, এসি বাসে যথেচ্ছ ভাড়া
আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে ঘরমুখী মানুষ। সড়ক ও রেলপথের পাশাপাশি সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও বেড়েছে যাত্রীদের ভিড়। তবে প্রতিবারের মতো এবারও ঈদযাত্রায় সাধারণ যাত্রীদের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দূরপাল্লার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের অতিরিক্ত ভাড়া। ঈদযাত্রার আগেই এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে সরকারি প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ফলে সুযোগ বুঝে বাস মালিকরা নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছেন।
বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত ভাড়ার চিত্র
নন-এসি বাসের ভাড়া সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত হলেও এসি বাসের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম খাটছে না। ফলে বিভিন্ন রুটে ভাড়া স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে:
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুট: এই রুটে স্বাভাবিক সময়ে এসি বাসের ভাড়া থাকে ১,১০০ থেকে ১,৬০০ টাকা। ঈদে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১,৪০০ থেকে ২,০৫০ টাকা। (যেখানে নন-এসি বাসের ভাড়া ৭০৪ টাকা)।
ঢাকা-কুড়িগ্রাম রুট: স্বাভাবিক সময়ের ১,১০০ থেকে ১,৪০০ টাকার ভাড়া ঈদে ঠেকেছে ১,৬০০ থেকে ২,৯০০ টাকায়।
ঢাকা-বরিশাল রুট: স্বাভাবিক সময়ের ৮৫০ থেকে ১,০০০ টাকার এসি ভাড়া এখন ১,২০০ থেকে ১,৮০০ টাকা।
ঢাকা-কক্সবাজার রুট: এসি বাসের ভাড়া ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে, যা স্বাভাবিক সময়ে ১,২০০ থেকে ১,৮০০ টাকার মধ্যে থাকত।
ঢাকা-ময়মনসিংহ রুট: মাত্র ১১৩ কিলোমিটার দূরত্বের এই রুটে নন-এসি ভাড়া ৩৩০ টাকা হলেও এসি বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৫০০ টাকা (৪০ আসন) এবং ২৮ আসনের বাসের ক্ষেত্রে ৭০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি আশ্বাস ও আইনি বাস্তবতা
গত ঈদুল ফিতরের সময় এসি বাসের ভাড়া নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। গত ৯ এপ্রিল সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছিলেন, দ্রুতই এসি বাসের ভাড়ার তালিকা তৈরি করা হবে। এরপর ২১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান আশ্বাস দেন যে, ঈদুল আজহার আগেই বিআরটিএ এসি বাসের ভাড়া দুই বা তিন স্তরে নির্ধারণ করে দেবে।
বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করতে হলে আইন ও বিধিমালায় সংশোধন প্রয়োজন। তবে সড়ক পরিবহন আইনের ৩৪(১) ধারা অনুযায়ী—সাধারণত বিলাসবহুল এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা না থাকলেও, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠলে সরকার বা কর্তৃপক্ষ যুক্তিসংগত ভাড়া নির্ধারণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, এই আইনি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আইন সংশোধনের অজুহাত দিয়ে মূলত বাস কোম্পানিগুলোকে বাড়তি মুনাফা লোটার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।
মালিকদের হাতেই ভাড়া নির্ধারণের দায়িত্ব
বিআরটিএ নিজে ভাড়া নির্ধারণ না করে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিকে এ দায়িত্ব হস্তান্তর করেছে। এর ফলে মালিকরা নিজেদের সুবিধাজনক উপায়ে বাসগুলোকে ‘বিজনেস ক্লাস’ (আমদানিকৃত বডি বা সিবিইউ) ও ‘ইকোনমি ক্লাস’ (দেশে সংযোজিত বডি বা সিকেডি) হিসেবে বিভক্ত করে চড়া ভাড়া নির্ধারণ করেছে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মালিকরা নিজেরা ভাড়া নির্ধারণ করলে যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
স্লিপার বাসের নকশাগত ত্রুটি ও দুর্ঘটনা ঝুঁকি
দূরপাল্লার রুটে চলাচলকারী ‘স্লিপার’ বা ‘স্যুইট ক্লাস’ বাসের গঠনগত নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদীউজ্জামান জানান, দেশে চলাচলকারী স্লিপার বাসগুলো মূলত একতলা বাস হিসেবে আমদানি করা হয়। পরবর্তীতে দেশে এনে নকশা বহির্ভূতভাবে মাঝখানে পাটাতন বসিয়ে সেগুলোকে অবৈধভাবে দ্বিতল বা খোপ বিশিষ্ট করা হচ্ছে। চ্যাসিসের নকশা পরিবর্তন করে দোতলা বানানোর ফলে বাসের ভরকেন্দ্র নষ্ট হচ্ছে এবং মহাসড়কে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
What's Your Reaction?
অনলাইন ডেস্কঃ